প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
নিষেধাজ্ঞা জয় করে ইরানের ড্রোন বিপ্লব: যেভাবে বদলে গেল বিশ্বযুদ্ধের সমীকরণ
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
কয়েক বছর আগে ইসরাইল-লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর তৎপরতা এবং ইয়েমেনে হুথিদের ব্যবহৃত ড্রোনের উৎস খুঁজতে গিয়ে প্রথমবারের মতো ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির বিষয়টি সামনে আসে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কিয়েভের আকাশে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় জাগায়। চার দশক ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা একটি দেশ কীভাবে আধুনিক সামরিক সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিল, তা এখন সামরিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বিষয়।১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশত্যাগ করলে ইরান এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। তখন বিমান বাহিনীর কাছে মার্কিন এফ-১৪ টমক্যাটের মতো উন্নত যুদ্ধবিমান থাকলেও মার্কিন প্রকৌশলীদের বিদায় এবং যন্ত্রাংশের অভাবে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। ১৯৮০ সালে ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান প্রযুক্তির অভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজার থেকে সরঞ্জাম কিনতে না পেরে তৎকালীন ইরানি নেতৃত্ব অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।১৯৮১ সালের দিকে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র ও প্রকৌশলী ছোট ও রিমোট নিয়ন্ত্রিত ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সস্তায় শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা। যুদ্ধের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণ ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করা এই দলে একজন বেসামরিক পাইলট, একজন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র এবং একজন স্বর্ণকারও ছিলেন। তাদের তৈরি প্রথম দিকের মডেলগুলো দেখতে খেলনার মতো হলেও ১৯৮৩ সালে তা সফলভাবে ইরাকি বাহিনীর অবস্থানের ছবি তুলতে সক্ষম হয়। এই সাফল্যের পর 'থান্ডার ব্যাটালিয়ন' গঠনের মাধ্যমে ইরানের নিয়মিত ড্রোন কর্মসূচি শুরু হয়।নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান দুবাই ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে বিভিন্ন বেসামরিক যন্ত্রাংশ ও চিপ সংগ্রহ করতে শুরু করে। শুরুর দিকে নজরদারির জন্য তৈরি হলেও ১৯৮৭ সাল থেকে ড্রোনকে আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা শুরু হয়। ইরানই বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি যারা ১৯৮৮ সালে সশস্ত্র চালকবিহীন আকাশযান বা ইউএভি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করে। যদিও ইসরাইল সত্তরের দশকে ড্রোন ব্যবহার করেছিল, কিন্তু ইরান সেই নকশা ও কৌশলকে আরও উন্নত এবং সাশ্রয়ী করে তোলে।ইরানের সামরিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের ভারসাম্য। তাদের ধারণা অনুযায়ী, একটি ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ২০ লাখ ডলারের ক্রুজ মিসাইলের মতো নিখুঁত না হলেও, একসাথে ১০০টি ড্রোন পাঠালে প্রতিপক্ষকে তা ধ্বংস করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। ড্রোনের খরচ যেখানে প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় ১০ থেকে ২০ গুণ কম, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী হামলা চালিয়ে শত্রুকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। নিচু উচ্চতায় ও কম গতিতে ওড়ায় এগুলো রাডারে শনাক্ত করাও বেশ কঠিন।২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা এই কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে, যেখানে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল। ওই হামলায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের ড্রোন ব্যবহার করে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করা হয়। এভাবেই ১৯৭৯ সালের অপেশাদার প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল নাগাদ ইরান এমন ড্রোন তৈরি করেছে যা হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম, যা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ