প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
এক ভাগে দুজনের কুরবানি: সহিহ হবে, নাকি পুরো কুরবানি নষ্ট হবে?
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা একটি অনন্য আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত। জিলহজ মাস ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মুসলমানদের মধ্যে কুরবানির প্রস্তুতি শুরু হয়। অনেকেই শরিকানায় বা ভাগে গরু, মহিষ কিংবা উট কুরবানি দিয়ে থাকেন। তবে কুরবানির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো— বড় পশুর একটি ভাগে কি দুই বা ততোধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন? অর্থাৎ, গরুর এক-সপ্তমাংশ (১/৭) বা এক ভাগে যদি একাধিক ব্যক্তি অংশ নেন, তবে কুরবানি আদায় হবে কি?শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য সঠিক নিয়তের পাশাপাশি তা আল্লাহর রাসুলের (সা.) নির্দেশিত পন্থায় হওয়া আবশ্যক। এই শরিকানার মাসআলাটি নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:বড় পশুতে শরিক হওয়ার মূল বিধান ও হাদিসের দলিলইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের পক্ষ থেকেই কুরবানি করা সম্ভব। অন্যদিকে গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি পৃথকভাবে শরিক হতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো— প্রত্যেক শরিকের অংশ যেন কমপক্ষে পূর্ণ এক-সপ্তমাংশ (১/৭) হয় এবং প্রতিটি ভাগ কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকেই হতে হবে।হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—‘আমরা হুদায়বিয়ার বছরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কুরবানি করেছি। একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরুও সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছি।’ (সহিহ মুসলিম: ১৩১৮-৩০৫৫)এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট যে, বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতটি ভাগ হতে পারে এবং প্রতিটি ভাগ স্বতন্ত্র হতে হবে।এক ভাগে একাধিক ব্যক্তি শরিক হলে কুরবানির হুকুমকুরবানি একটি নির্ধারিত সীমার ইবাদত হওয়ায় শরিয়ত বড় পশুর এক-সপ্তমাংশকে একজন ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যদি দুই বা তিনজন ব্যক্তি মিলে একটি ভাগের টাকা ভাগাভাগি করে যৌথ মালিকানায় কুরবানি দেন, তবে প্রত্যেকের অংশ এক-সপ্তমাংশের চেয়ে কম হয়ে যায়। এর ফলে শরিয়তের মূল শর্ত লঙ্ঘিত হয়।ফকিহ ও মুফতিদের সর্বসম্মত অভিমত হলো— যদি কোনো একজন শরিকের অংশও এক-সপ্তমাংশের (১/৭) কম হয়, তবে ওই পশুর কোনো শরিকেরই কুরবানি সহিহ হবে না। অর্থাৎ, একটি ভাগে একাধিক ব্যক্তি অংশ নিলে পুরো পশুর কুরবানিই নষ্ট হয়ে যাবে।ফিকহবিদদের স্পষ্ট মতামতনির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহ গ্রন্থগুলোতে এই বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে:বাদায়েউস সানায়ে ও ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: "গরু বা উটের প্রতিটি ভাগে একাধিক ব্যক্তির শরিক হওয়া বৈধ নয়। যদি কোনো শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তবে কোনো শরিকেরই কুরবানি সহিহ হবে না।" (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৩০৪)আল-মুগনি (হাম্বলি মাজহাব): বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, "এক পশুতে সাতজনের বেশি শরিক হলে কুরবানি সহিহ হবে না।" (আল-মুগনি ১৩/৩৯০)আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে শরিয়তসম্মত সমাধানঅনেক সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্য বা ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা জোগাড় করেন। সরাসরি যৌথভাবে এক ভাগে নাম না দিয়ে শরিয়তসম্মত উপায়ে এর একটি সুন্দর সমাধান করা সম্ভব:"ধরা যাক, তিন ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেক্ষেত্রে তারা সেই অর্থ যেকোনো একজন ভাইকে ‘হেবা’ বা উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন। এরপর ওই ভাই নিজের নামে পূর্ণ এক ভাগে শরিক হবেন। এর ফলে অন্তত একজনের কুরবানি সহিহভাবে আদায় হবে এবং বাকিরা তাকে সহযোগিতা করার কারণে সওয়াব পাবেন। পরবর্তীতে তারা সবাই মিলে নিজেদের মধ্যে গোশত ভাগ করে নিতে পারবেন।" (খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫)কুরবানির ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি বিষয়সমূহ:বড় পশুর প্রতিটি ভাগ বা অংশ কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামেই হতে হবে।এক ভাগে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যৌথভাবে মালিক হলে পুরো পশুর কুরবানি বাতিল হয়ে যাবে।একটি বড় পশুতে কোনোভাবেই সাতজনের বেশি শরিক নেওয়া যাবে না।প্রচলিত রেওয়াজ বা আবেগের বশে নয়, বরং শরিয়তের নিখুঁত নিয়ম মেনে ইবাদত করাই কবুল হওয়ার একমাত্র পথ।সুতরাং, কুরবানির পশু ক্রয়ের আগেই শরিকানার মাসআলাগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া এবং আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী বিশুদ্ধ নিয়তে ও সঠিক পদ্ধতিতে কুরবানি সম্পন্ন করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ