প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
ভারত-পাকিস্তান সামরিক কৌশলে ডোন যুগের সূচনা
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
এক বছর আগে ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত হওয়া সামরিক সংঘাত ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধকৌশলে একটি নতুন দিক খুলে দিয়েছে, যাকে দুই দেশের মধ্যকার প্রথম ‘ড্রোন যুদ্ধ’ বলা চলে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে পর্যটকসহ ২৭ জন নিহত হওয়ার জেরে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দায়ী করে ভারত 'অপারেশন সিন্দুর' নামের সামরিক অভিযানটি চালায়। ওই ৪ দিনের সংঘাতে দুই দেশই 'ইহা', 'হারোপ' ও 'সংগার'-এর মতো আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম ব্যবহার করে, যা উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে।২০২৫ সালের মে মাসের আগেই এই ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা শুরু হয়েছিল এবং সরকারি তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ১৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল। ২০২১ সালের জুনে জম্মুর একটি বিমান বাহিনী ঘাঁটিতে ড্রোনের সাহায্যে বিস্ফোরণের পর থেকে সামরিক স্থাপনাগুলোর চারপাশের নিরাপত্তা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।পাকিস্তানের সীমান্তে অনবরত ড্রোন অভিযান ভারতকে পাল্টা অভিযানে বাধ্য করেছে এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীকে এখন শত্রুর যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সব আকৃতির ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে ড্রোনে পারিপার্শ্বিক ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ায় তাদের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানে প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোনভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কম খরচের ড্রোনের বিরুদ্ধে দামি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বদলে কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জ্যামার মোতায়েন করছে, তবে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য ‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেছে।স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০client২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে থেকে ৯ হাজার ২১০ কোটি ডলার এবং পাকিস্তান ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ভারত বর্তমানে মূলত নজরদারির জন্য ইসরাইল-নির্মিত 'হেরন' ও 'সার্চার' ড্রোন ব্যবহার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারে ৩১টি 'এমকিউ-৯বি' ড্রোন কেনার চুক্তি করেছে যা ২০২৯-২০৩০ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। তবে কামিকাজি ড্রোনের জন্য ভারত এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং ড্রোনের মূল যন্ত্রাংশের বাজারে চীনা আধিপত্য থাকায় ভারতের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।সামরিক বাজেট কম হওয়া সত্ত্বেও সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেছে এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তারা তুরস্ক থেকে আকিনজি ও বায়রাক্তার টিবি-২ এবং চীন থেকে ২৩টি উইং লুং-২ সিস্টেমসহ মোট ৩৫টি সশস্ত্র ড্রোন পেয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান দেশীয়ভাবে প্রায় ৩০ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম ‘শাহপার-থ্রি’ এবং ‘বর্রাক’ ও ‘উকাব’ নামের ড্রোন তৈরি করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রতিরোধী ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে।বর্তমানে দুই দেশের সেনাবাহিনীই ২০২৫ সালের সংঘাতকে একটি শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং সম্মুখসারির সৈন্যদের ড্রোন চালনার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাটালিয়নে ড্রোন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ভারতের পরবর্তী লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত সোয়ার্ম ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধ করার প্রযুক্তির উন্নয়ন করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন মানুষের কাজকে সহজ করলেও দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের জন্য এটি লড়াইকে কম ধ্বংসাত্মক উপায়ে রাখবে নাকি আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ