প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ওলটপালট এশিয়ার অর্থনীতি ও রাজনীতি
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট পুরো এশিয়া মহাদেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান এই সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের বাসা থেকে কাজ করতে এবং বিদেশ সফর কমাতে অনুরোধ করেছেন। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন এশীয় দেশ জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে বাধ্য হচ্ছে।১. গভীর হচ্ছে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকটপাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো দেশে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জ্বালানির মজুত নিয়ে; ইন্দোনেশিয়ার হাতে মাত্র তিন সপ্তাহ এবং ভিয়েতনামের হাতে এক মাসেরও কম জ্বালানি মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে এবং গ্রামীণ পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে।উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ইউরিয়া সারের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ডিজেল ও সারের তীব্র সংকটে পড়েছেন এশিয়ার লাখ লাখ ধানচাষি, যা দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউটের মতে, চলতি বছর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।২. শিল্প খাতে উৎপাদন বিপর্যয়বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ডিজেল ও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক রঙের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। কাঁচামালের (ন্যাফথা) ঘাটতির কারণে এশিয়ার কয়েকটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। জাপানের খাদ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ক্যালবি’ খরচ কমাতে তাদের পণ্যের প্যাকেজিংয়ে পর্যন্ত পরিবর্তন এনেছে। ফিলিপাইনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২.৮ শতাংশে, যা মহামারির পর সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।৩. সরকারের ওপর আর্থিক চাপ ও গণ-অস্থিরতাজ্বালানির দাম ও সার ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারত প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলার এবং ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার ব্যয় করছে। এভাবে দীর্ঘদিন ভর্তুকি দেওয়া রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। মূল্যবৃদ্ধির এই চরম পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার (২০২২ সালের) মতো সরকার পতনের আশঙ্কায় রয়েছে অনেক দেশ। ইতোমধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তীব্র গণ-বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।৪. বিকল্প উৎসের সন্ধান ও ভূ-রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতিসংকট মোকাবিলায় থাইল্যান্ড এখন ব্রাজিল ও লিবিয়া থেকে তেল কিনছে এবং অনেক দেশ জৈব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু দেশ লাভবান হচ্ছে:অস্ট্রেলিয়া: প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার বড় রপ্তানিকারক হিসেবে দেশটি ব্রুনেই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন জ্বালানি চুক্তি করেছে।চীন: বিশাল তেল মজুত ও শক্তিশালী সৌর-উইন্ড প্রযুক্তির কারণে চীন কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে। তারা ভিয়েতনাম, লাওস এমনকি মার্কিন মিত্র দেশ অস্ট্রেলিয়াতেও জেট ফুয়েল ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ করে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।৫. আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তহাজার হাজার মাইল দূরের এই সংঘাতের মুখে পড়ে এশিয়ার দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যকার পুরোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধ ভুলে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি ফিলিপাইনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা যৌথ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ২০৩৫ সালের মধ্যে এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড সংযুক্ত করতে ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা এ অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ