প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
পবিত্র কাবার ভেতর ও বাইরের অজানা ইতিহাস
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
বিশ্ব মুসলিমের হৃদস্পন্দন পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে মক্কা নগরীতে বার্ষিক হজ উৎসব শুরু হয়েছে। ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম এই স্থানটি মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যার দিকে মুখ করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন। কাবার কাঠামোগত পরিমাপ অনুযায়ী এটি উচ্চতায় প্রায় ১৩.১ মিটার, দৈর্ঘ্যে ১২.৮ মিটার এবং প্রস্থে ১১.০৩ মিটার। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তার পুত্র হজরত ইস্মাইল (আ.) এই পবিত্র ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মূর্তিমুক্ত করে একত্ববাদী ইবাদতের মূল কেন্দ্রে রূপান্তর করেন।বাইরে থেকে কাবার জাঁকজমক দৃশ্য চোখে পড়লেও এর ভেতরের অংশটি অত্যন্ত সাদামাটা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। কাবার উত্তর-পূর্ব দিকে মাটির চেয়ে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি ৩.১ মিটার উঁচু একটি প্রবেশদ্বার রয়েছে, যা বছরে সাধারণত দুবার বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কাবার অভ্যন্তরভাগ ধৌত করার জন্য খোলা হয়। কাবার ভেতরে ছাদকে ধরে রাখার জন্য তিনটি প্রাচীন কাঠের স্তম্ভ এবং ছাদে ওঠার একটি সিঁড়ি রয়েছে। এর মেঝে এবং দেয়ালগুলো মার্বেল পাথরে মোড়ানো, সিলিং থেকে সুদৃশ্য লণ্ঠন ঝুলছে এবং ভেতরের দেয়ালগুলো ঐতিহ্যগতভাবে লাল, সবুজ বা গাঢ় নীল রঙের জিগ-জ্যাগ নকশার কাপড়ে ঢাকা থাকে।কাবার বাইরের অংশটি খাঁটি রেশম এবং সোনা-রুপার সুতোয় বোনা 'কিসওয়াহ' নামের একটি কালো চাদর বা গিলাফ দিয়ে আবৃত থাকে। এই কিসওয়াহর মূল অংশটি ৪৭টি খণ্ডে বিভক্ত ১৪ মিটার উঁচু রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি হয়, যার ওপরের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে প্রায় ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৪৭ মিটার দীর্ঘ একটি স্বর্ণখচিত বেল্ট বা 'হিজাম' থাকে এবং দরজার ওপর ঝোলানো অলংকৃত পর্দাটিকে বলা হয় ‘সিতারা’ বা ‘বুরকু’। কাবাকে গিলাফ দিয়ে ঢেকে রাখার প্রথাটি প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই চলে আসছে, যেখানে ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আসআদ কামিল সর্বপ্রথম ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা শরিফ সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত করেছিলেন। ইসলামী খেলাফতের যুগে কিসওয়াহ তৈরির দায়িত্ব রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে পরিবর্তিত হয়ে মিশর, সিরিয়া ও বাগদাদে স্থানান্তরিত হলেও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর এর একক দায়িত্ব লাভ করে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবার।বর্তমানে মক্কার নিজস্ব কিসওয়াহ কারখানায় ২৪০ জনেরও বেশি শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী তাঁত এবং ক্যালিগ্রাফি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই গিলাফ তৈরি করা হয়। ইতালি থেকে আমদানিকৃত কাঁচা রেশমকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধুয়ে ও রং করে একটি কিসওয়াহ তৈরিতে আনুমানিক ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম, ১২০ কেজি ২৪-ক্যারেট সোনার সুতো এবং প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি রুপার সুতো প্রয়োজন হয়, যার পেছনে সমসাময়িক বাজারে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল (প্রায় ৬৬.৫ লাখ মার্কিন ডলার)। এই গিলাফের গায়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, তাওহিদের বাণী এবং হজের ফজিলত সম্পর্কিত ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলা হয়।ইতিহাসে কিসওয়াহর রং সবসময় কালো ছিল না; উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে সাদা, সবুজ, লাল এবং হলুদ রঙের গিলাফ ব্যবহারের নজির থাকলেও আব্বাসীয় আমলের শেষভাগ থেকে কালো রংটি স্থায়ী রূপ নেয়। প্রতি বছর হজের সময় বিশেষায়িত কর্মী দলের মাধ্যমে কাবার পুরনো গিলাফটি সরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি গিলাফ প্রতিস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে পুরনো গিলাফটির স্বর্ণ ও রুপার সুতোয় বোনা মূল্যবান আয়াত সংবলিত অংশগুলো কেটে আলাদা করে আন্তর্জাতিক জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য কিংবা বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট সাধারণ কাপড়ের অংশগুলো ছোট টুকরো করে কূটনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের মাঝে স্মারক হিসেবে বিতরণ করা হয়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ