প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
হঠাৎ কেন উত্তর কোরিয়া সফরে শি জিনপিং, কী ঘটছে পর্দার আড়ালে?
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
দীর্ঘ সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার (৮ জুন) পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক কর্মসূচি ও পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি জিনপিংয়ের বিদেশ সফরের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে (২০১৩-২০১৯ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১৪টি সফর করলেও ২০২২-২০২৫ সালের মধ্যে তা বার্ষিক মাত্র ৬টিতে নেমে এসেছে)। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনেতারা যেখানে নিজে বেইজিংয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেখানে শি জিনপিং নিজে পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন—যা বেইজিংয়ের কাছে এই সফরের গুরুত্ব কতটা বেশি তা স্পষ্ট করে।বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক সফরের নেপথ্যে মূল কারণগুলো হলো:১. রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতায় বেইজিংয়ের উদ্বেগ:
ঐতিহ্যগতভাবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বেইজিং সবসময়ই ‘বড় ভাই’ বা প্রধান অভিভাবকের ভূমিকায় থেকেছে। এমনকি উত্তর কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে এই সমীকরণে বদল আসতে শুরু করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রেমলিনের সামরিক চাহিদা মেটাতে উত্তর কোরিয়া দেদারসে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য সরবরাহ করে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’র তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে উত্তর কোরিয়াকে এর বিনিময়ে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে মস্কো, যার বড় অংশই গোপন সামরিক ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি হিসেবে কিমের হাতে পৌঁছেছে। পিয়ংইয়ং যাতে পুরোপুরি মস্কোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সেজন্যই চীন উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের প্রভাব পুনরুত্থান করতে চায় এবং এর জন্য নতুন কোনো বড় অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা সহায়তার প্রস্তাব দিতে পারে।২. ক্ষমতার ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষা:
উত্তর কোরিয়ার হাতে রাশিয়ার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি চলে আসার বিষয়টি চীনের জন্য চিন্তার কারণ। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, বেইজিং সবসময়ই উত্তর কোরিয়াকে সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে সতর্ক ছিল। কারণ উত্তর কোরিয়া অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা কোরীয় উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। ইতোমধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে উত্তর কোরিয়া আটটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ট্যাক্টিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্মোচন করেছে এবং কিম জং উন নিজে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান উৎপাদনকারী কারখানাও পরিদর্শন করেছেন।৩. মার্কিন মিত্রদের তৎপরতা ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যাশা:
কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহায়তা চুক্তির খবর এবং এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের তৎপরতা বৃদ্ধি বেইজিংকে এই অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বাধ্য করছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের সংকট নিরসনে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে।সব মিলিয়ে, কিম জং উনের ওপর রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ছায়া নিয়ন্ত্রণ করা এবং পূর্ব এশিয়ায় নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক কতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন শি জিনপিংয়ের এই আকস্মিক পিয়ংইয়ং সফরের মূল লক্ষ্য।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ