প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
যন্ত্রের শব্দেও শ্রমিকদের বুকে ফুটবলের স্বপ্ন
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ঢাকা শহর যখন রঙে ও শব্দে বদলে যায়, তখন এর আরেকটি স্তরে গার্মেন্টস ও বিভিন্ন কলকারখানার আলো-আঁধারিতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের দিন কাটে যন্ত্রের গতিতে। ঘড়ির কাঁটা, মেশিনের গুঞ্জন আর ক্লান্ত শরীরের ভেতরেও এই মানুষগুলোর মধ্যে ফুটবল নিয়ে এক অন্যরকম উন্মাদনা ও স্বপ্ন জেগে ওঠে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যন্ত্রের সঙ্গে লড়াই করা এই শ্রমিকদের কাছে বিশ্বকাপ যেন একটুকরো আনন্দ এবং একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ, যেখানে সেলাই মেশিনের শব্দের পাশাপাশি সমানতালে চলে কে জিতবে বা কোন খেলোয়াড় ইতিহাস বদলাবে তা নিয়ে হৃদয়ের গভীরের আলোচনা।গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিশ্বকাপ এলে শ্রমিকদের জীবনে আলাদা রঙ নেমে আসে। কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনে খেলা দেখা, বিরতিতে হাইলাইটস কিংবা রাতে বাসায় ফিরে রিপ্লে দেখার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে তাদের ফুটবল জীবন। নারায়ণগঞ্জের এক পোশাক কারখানার শ্রমিক রিনা আক্তার জানান, সারাদিন কাজের পর শরীর ক্লান্ত থাকলেও বিশ্বকাপের গোল তাদের মনের ভেতরটা হালকা করে দেয় এবং দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। একই কারখানার সেলিম মিয়া বলেন, তারা মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে বিরতির সময়ে তর্ক ও হাসি-ঠাট্টা করেন, যা কারখানার ভেতরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।গাজীপুরের সুইং অপারেটর শারমিন আক্তার জানান, রাতের শিফটে কাজ করার সময় তারা মোবাইলে খেলা শোনেন এবং গোল হলে সবার চিৎকারে মনে হয় তারা সবাই একসঙ্গে কোনো বড় মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। আশুলিয়ার শ্রমিক জসিম উদ্দিনের কাছে বিশ্বকাপ মানে শৈশবের হারানো আনন্দ ফিরে পাওয়া। এই বিশ্বকাপ ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ সব ক্লান্তি ও শ্রেণীভেদ ভুলে সবাইকে এক অদৃশ্য গ্যালারিতে এনে দাঁড় করায়। গার্মেন্টস কারখানার বিশাল ফ্লোরে বিরতির সময় শ্রমিকেরা ছোট ছোট দল বা আলাদা গ্যালারিতে রূপ নেয়, যেখানে কেউ মোবাইল ধরে খেলা দেখায় আর কেউ পাশে দাঁড়িয়ে স্কোর জানার অপেক্ষায় থাকে, যা কারখানাগুলোকে একেকটি জীবন্ত স্টেডিয়ামে পরিণত করে।ঢাকার একটি ছোট প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক মনিরা বেগম জানান, কাজের সময়ে মালিকেরা সাধারণত খুশি না হলেও বিশ্বকাপের সময় সবাই বিষয়টি একটু ছাড় দিয়ে বুঝে নেয়। কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শ্রমিকেরা চায়ের দোকানে কাপ হাতে আড্ডায় মেতে ওঠে এবং কোন গোলটি সবচেয়ে সুন্দর হলো তা নিয়ে আলোচনা করে। নারায়ণগঞ্জের এক চায়ের দোকানদারও জানান, বিশ্বকাপের সময় বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি সেখানে একটি অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়।ক্লান্ত শরীর, কম ঘুম আর পরের দিনের কাজের চিন্তার ভেতরেও বিশ্বকাপ এই শ্রমিকদের কাছে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা কয়েক মিনিটের জন্য হলেও নিজেদের জীবনকে ভুলে থাকতে পারে। বিশ্বকাপ শেষ হলে আবারও মেশিনের শব্দ, কাজের চাপ ও সময়ের দৌড়াদৌড়ির আগের জীবন ফিরে আসে। তবে কিছুদিনের জন্য পাওয়া এই আনন্দটুকু শ্রমিকদের জীবনের ক্লান্ত পাতায় একটুকরো আলো হয়ে থেকে যায় এবং কারখানাগুলোকে রূপ দেয় একেকটি নীরব গ্যালারিতে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ