প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক ও ইসলামি অর্থব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি আজ এমন এক গভীর রূপান্তরপর্বে প্রবেশ করেছে, যেখানে এটি নৈতিকতা, ক্ষমতার রাজনীতি, প্রযুক্তি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের জটিল সমীকরণের একটি সভ্যতাগত কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে বিশ্ব অর্থনীতি একদিকে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, অন্যদিকে বিকল্প নৈতিক অর্থব্যবস্থার সন্ধানে ক্রমশ ব্যাকুল হয়ে উঠছে এবং এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যেই ইসলামি অর্থনীতি একটি বিকল্প কাঠামো হিসেবে গুরুত্ব অর্জন করছে। ঐতিহাসিক ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গড়ে তোলার পর থেকে পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা ও সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার ওপর ভর করে চলা এই বৈশ্বিক কাঠামো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য এবং কেন্দ্র-প্রান্ত বিভাজনকে গভীরতর করেছে।১৯৭১ সালে স্বর্ণমান ব্যবস্থা থেকে ডলারের বিচ্ছিন্নতার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাস্তব উৎপাদনের পরিবর্তে ঋণ সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে। সাবপ্রাইম মর্টগেজ ও জটিল আর্থিক ডেরিভেটিভের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই কৃত্রিম অর্থনৈতিক বুদবুদটি বাস্তব সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ার কারণে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি ভাগাভাগি, সম্পদভিত্তিক লেনদেন এবং সুদ নিষিদ্ধকরণের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ইসলামি অর্থনীতি কেবল ধর্মীয় বিকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক ও কাঠামোগত অর্থব্যবস্থা হিসেবে আলোচনায় আসে।কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামি ফিকহ একাডেমির নীতিমালার আলোকে গঠিত এই ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার, সামাজিক ভারসাম্য ও সম্পদের সুষম বণ্টনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তব প্রয়োগে ইসলামি অর্থনীতি এখনও একটি ধীরে বিকাশমান রূপান্তরধর্মী ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান। বর্তমান ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শরিয়াহসম্মত চুক্তি ব্যবহৃত হলেও অনেক ক্ষেত্রে এগুলো প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প ফর্ম হিসেবে পরিচালিত হওয়ায় তাত্ত্বিক আদর্শ এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সমকালীন অর্থনীতিবিদদের মতে, লক্ষ্য কেবল সুদ বর্জন নয় বরং ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় এটি এখনও সম্পূর্ণ ঝুঁকি-ভাগাভাগিভিত্তিক আদর্শে পৌঁছাতে পারেনি।এদিকে মার্কিন-চীন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মতো ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন 'বিভক্ত বিশ্বায়ন' হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই বিভক্ত ব্যবস্থায় নৈতিক বিনিয়োগ ও সামাজিক অর্থায়নের কারণে ইসলামি অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও এটি এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা এবং প্রযুক্তিগত আর্থিক অবকাঠামোর দিক থেকে পূর্ণ ক্ষমতাশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির মুনাফাকেন্দ্রিক দক্ষতা এবং ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক সামাজিক দায়িত্বের ভিন্ন দর্শনের কারণে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা একটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের গবেষণায় দেখা যায়, সুকুক ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও এটি এখনও প্রধানধারার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প না হয়ে বরং সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। সার্বিকভাবে প্রচলিত পুঁজিবাদী কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সংকট বৃদ্ধির এই সময়ে ইসলামি অর্থনীতিকে পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক মডেলে রূপ দিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ