প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
ছাগল পালনে আনোয়ারার অভাবনীয় সাফল্য, অনুপ্রাণিত চরফ্যাশনের হাজারো নারী
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
চরফ্যাশনের বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরবর্তী চর মানিকা ইউনিয়নের চর আইচা গ্রামের সংগ্রামী নারী আনোয়ারা বেগম। স্বামী হারানোর পর ছোট ছেলে আর বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যখন তিনি চরম অভাবের সংসারে দিন কাটাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে 'আরএইচএল প্রকল্প'। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি আধুনিক উঁচু মাচার ছাগলের ঘর এবং জলবাযু-সহনশীল পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পান।প্রশিক্ষণ শেষে ২০,০০০ টাকার একটি ঋণ নিয়ে আনোয়ারা তার ছোট্ট খামারটি শুরু করেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রম, সঠিক যত্ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেখতে দেখতেই খামারে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং গত ঈদুল আজহায় তিনি ২টি সুস্থ-সবল ছাগল বেশ ভালো দামে বিক্রি করে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করেন। আনোয়ারার এই সাফল্য শুধু তার নিজের পরিবারকেই বদলে দেয়নি, বরং পুরো গ্রামের নারীর অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আনোয়ারা বেগম বলেন, আগে সাধারণ পদ্ধতিতে ছাগল পালনে রোগবালাই বেশি হতো, কিন্তু এখন মাচা পদ্ধতিতে রোগবালাই প্রায় হয় না বললেই চলে এবং তারা লাভবান হচ্ছেন।পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ)-এর আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত এই ‘আরএইচএল প্রকল্পের’ আওতায় স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এফডিএ নারীদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং মাচা তৈরির সম্পূর্ণ খরচসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে। ইতোমধ্যে চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার নারীকে সম্পূর্ণ মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৬২৫ জন সদস্যকে মাচা পদ্ধতির ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।এফডিএ-এর আরএইচএল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মেহেদী আজম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও মাচা পদ্ধতির সমন্বয়ে ছাগল পালন রোগঝুঁকি কমায়, উৎপাদন বাড়ায় এবং খামারিদের স্বাবলম্বিতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। সংস্থার সিনিয়র প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী শংকর চন্দ্র দেবনাথ জানান, তাদের মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ নারীদের মধ্যে একটি টেকসই সক্ষমতা তৈরি করা, যা জলবাযু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও অত্যন্ত কার্যকর। এফডিএ পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন উল্লেখ করেন, মাচা পদ্ধতিতে সঠিক যত্ন পাওয়ায় ছাগলের রোগ প্রতিরোধ ও প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেকে ছাগলের মল-মূত্র পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংরক্ষণ করে পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন।এই উদ্যোগের ভূঁয়সী প্রশংসা করে চরফ্যাশন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাজন আলী বলেন, মাচা পদ্ধতি একটি বিজ্ঞানসম্মত ও লাভজনক উপায়, যার মাধ্যমে অল্প জায়গায় অধিক ছাগল পালন করা যায় এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এড়ানো সম্ভব হওয়ায় রোগবালাই নিযন্ত্রণ করা সহজ হয়। তিনি জানান, সরকারিভাবেও এই খামারিদের সব ধরনের পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।এক সময়ের অসহায় আনোয়ারা বেগম আজ একজন সফল খামারি ও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার একটি ছাগল থেকে শুরু হওয়া খামারটি এখন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো চরফ্যাশন ও মনপুরার দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য স্বপ্ন দেখার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ