প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
সীমান্তে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি
ঢাকা নিউজ ডেস্ক ||
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনা-এর যৌথ উদ্যোগে গত বুধবার (২৪ জুন) ‘সীমান্তে পুশ-ইন: বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নীতিগত বিকল্প’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুম প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় শিক্ষাবিদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়ে বিষয়টি নিরাপত্তা, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেন।সিপিএস-এর পরিচালক ও অধিবেশনের সঞ্চালক অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন তার সূচনা বক্তব্যে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে মালয়েশিয়া ও চীনে সফল রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করছেন, ঠিক তখনই ভারতীয় সীমান্তে উত্তেজনা, ব্যাপকভাবে ভারতীয় মুসলিমদের পুশ-ইনের চেষ্টা, সীমান্ত হত্যা এবং বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মতো ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সাথে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা ও পানিসহ বিভিন্ন বিরোধের সমাধানের ওপর জোর দেন।ওয়েবিনারে ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনা-এর ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ বাংলাদেশি-বিরোধী মনোভাব এবং প্রান্তিক সীমান্তবাসীদের প্রতি অমানবিক আচরণের ওপর আলোকপাত করেন। ২০২৪ সালে ভারত সফরের একটি ঘটনা স্মরণ করে তিনি জানান, নিরাপত্তার খাতিরে আয়োজকরা তাকে বাংলাদেশি পরিচয় গোপন রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিদ্বেষকে আরও গভীর করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামান বাংলাদেশের অস্তিত্বগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতকে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করেন। ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রতি সম্ভাব্য হুমকিকে অবহেলা করার বিষয়ে সতর্ক করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানান। তিনি চীন এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন।ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান ভারতে ২ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি থাকার দাবিকে কোনো যাচাইকৃত তালিকা ছাড়া বারবার ব্যবহৃত ভারতীয় রাজনীতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি, বলিষ্ঠ কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত বাণিজ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ সুবিধাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের নীতিকে আধিপত্যবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন, একতরফা পুশ-ইন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রহণ করবে যাকে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা যাবে, তবে ভারতকে অবশ্যই আগে সঠিক নথিপত্র প্রদান করতে হবে এবং সম্মত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ভারতীয় মুসলমানদের প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে পুশ করা উচিত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।দৈনিক যুগান্তর-এর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার বলেন, বাংলাদেশ যখনই আধিপত্যকে প্রতিহত করেছে এবং সাহসের সাথে স্বাধীনতা রক্ষা করেছে, তখনই টিকে থেকেছে। তিনি এ ধরনের সামাজিক প্রস্তুতি পুনর্গঠন, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয়গুলো জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে তুলে ধরা, কূটনৈতিক মিশনের সংস্কার, সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশের মিডিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।অধিবেশনের সভাপতি ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী পুশ-ইন ইস্যুটিকে একই সাথে মানবিক ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ হিসেবে বর্ণনা করেন। ভারতের সাথে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি প্রমাণ করতে হবে যে আমরা দুর্বল না, এমন মন্তব্য করে তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিপিএসকে নীতিগত সুপারিশমালা তৈরির তাগিদ দেন।ওয়েবিনারের প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় ঐক্যমতের অভাব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং যেকোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণের আগে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. নেছার ইউ. আহমেদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি ও প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ