প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬
ইরান সংঘাতে মুসলিম বিশ্ব নীরব, বাড়ছে অবিশ্বাস ও বিভক্তি
||
চলমান সংঘাতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলার পরও মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কোনো দেশ সরাসরি সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, মুসলিম ঐক্যের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে বাস্তবে রাজনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসই এখানে প্রধান ভূমিকা রাখছে।দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই উত্তেজনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বহু দেশ প্রভাবিত হলেও অধিকাংশ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। অনেক দেশ আবার ইরানকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করছে, যা তাদের নীতিগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে।বিশ্লেষকদের মতে, সুন্নি-শিয়া বিভাজন, ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে আসছে। ইরান শিয়া-প্রধান রাষ্ট্র হওয়ায় সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল। ফলে বর্তমান সংঘাতে ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী। তারা আশঙ্কা করছে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে তাদের নিজস্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ ও জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইরানের সাম্প্রতিক কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে তেহরান হয়তো বৃহত্তর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বরং এতে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ইরানের প্রতি অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।এছাড়া, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসলেও সাম্প্রতিক সংঘাতে সেই নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। লেবানন, সিরিয়া ও গাজার প্রেক্ষাপটে ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর কার্যকারিতা আগের তুলনায় কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।অন্যদিকে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে তারা কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনও সেই প্রচেষ্টার অংশ ছিল।বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে পরিবর্তন আনছে। ইরানের প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে, পাশাপাশি আঞ্চলিক জোট ও সম্পর্কগুলোও নতুনভাবে গঠিত হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে কিছু আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।সব মিলিয়ে, এই সংঘাত শুধু সামরিক উত্তেজনা নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের জটিল বাস্তবতাকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ওমর ফারুক
প্রকাশক: আনোয়ার শাহ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ