ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের এক অদম্য শক্তি হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সদস্য এবং 'বাসিজ'-এর সাড়ে ৪ লাখ রিজার্ভ সৈন্য নিয়ে গঠিত এই বাহিনী দেশটির রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসিকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানালেও তারা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইআরজিসির ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর একটি মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৮০ সালে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এটি একটি সম্মুখ সারির নিয়মিত বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই সময় থেকেই তারা অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনের পাশাপাশি বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বিশেষ করে কুর্দি ও বালুচ বিদ্রোহ দমনে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বর্তমানে মার্কিন স্থল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়াবাহিনী গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে মোকাবিলা করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে আইআরজিসির। ১৯৮২ সালে গঠিত 'কুদস ফোর্স' লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে সহায়তা করে, যা শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে ইরাক যুদ্ধের সময়ও আইআরজিসি সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো উন্নত প্রযুক্তির বোমা ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা আইআরজিসির 'ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ' কৌশলের সফল প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ইতিহাস উত্থান-পতনে ঘেরা। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে ইরান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে 'অশুভ অক্ষ' বা 'অ্যাক্সিস অব ইভিল'-এর অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর ওবামা প্রশাসনের সময় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছুটা সমন্বয় দেখা গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর উত্তেজনা পুনরায় চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আইআরজিসি বর্তমানে এই সংঘাতকে ১৯৭৯ সালের পর থেকে চলা মার্কিন ষড়যন্ত্রের একটি অংশ হিসেবেই দেখছে।
বিগত এক মাসের বিমান হামলায় আইআরজিসি কিছুটা দুর্বল হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রক্ষায় তারা অত্যন্ত সংকল্পবদ্ধ। তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও। বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তারা তার ছেলে মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা অনুযায়ী, এই বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটি আত্মসমর্পণ করার বদলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের এক অদম্য শক্তি হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সদস্য এবং 'বাসিজ'-এর সাড়ে ৪ লাখ রিজার্ভ সৈন্য নিয়ে গঠিত এই বাহিনী দেশটির রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসিকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানালেও তারা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইআরজিসির ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর একটি মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৮০ সালে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এটি একটি সম্মুখ সারির নিয়মিত বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই সময় থেকেই তারা অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনের পাশাপাশি বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বিশেষ করে কুর্দি ও বালুচ বিদ্রোহ দমনে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বর্তমানে মার্কিন স্থল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়াবাহিনী গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে মোকাবিলা করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে আইআরজিসির। ১৯৮২ সালে গঠিত 'কুদস ফোর্স' লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে সহায়তা করে, যা শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে ইরাক যুদ্ধের সময়ও আইআরজিসি সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো উন্নত প্রযুক্তির বোমা ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা আইআরজিসির 'ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ' কৌশলের সফল প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ইতিহাস উত্থান-পতনে ঘেরা। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে ইরান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে 'অশুভ অক্ষ' বা 'অ্যাক্সিস অব ইভিল'-এর অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর ওবামা প্রশাসনের সময় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছুটা সমন্বয় দেখা গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর উত্তেজনা পুনরায় চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আইআরজিসি বর্তমানে এই সংঘাতকে ১৯৭৯ সালের পর থেকে চলা মার্কিন ষড়যন্ত্রের একটি অংশ হিসেবেই দেখছে।
বিগত এক মাসের বিমান হামলায় আইআরজিসি কিছুটা দুর্বল হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রক্ষায় তারা অত্যন্ত সংকল্পবদ্ধ। তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও। বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তারা তার ছেলে মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা অনুযায়ী, এই বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটি আত্মসমর্পণ করার বদলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন