ঢাকা নিউজ

বিশ্ব বাণিজ্যের ভাগ্য নির্ধারক যে ৫টি সরু সমুদ্রপথ



 বিশ্ব বাণিজ্যের ভাগ্য নির্ধারক যে ৫টি সরু সমুদ্রপথ
ছবি : সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। এই সংকট বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে এনেছে—তা হলো মাত্র কয়েকটি সরু সমুদ্রপথ বা ‘বটলনেক’-এর ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির চরম নির্ভরশীলতা।

১. হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ এটি, যা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরকে যুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ৩৯ শতাংশ এবং গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এখানে জাহাজ চলাচলে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন ও সার রপ্তানিকেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

২. সুয়েজ খাল: এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাত্রাপথ অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দেওয়া এই খাল দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এর দক্ষিণে অবস্থিত ‘বাব আল মানদাব’ প্রণালিতে হুথি গোষ্ঠীর হামলার কারণে জাহাজগুলো এখন আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২১ সালে একটি জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এই খালের গুরুত্ব ও ঝুঁকি উভয়ই স্পষ্ট করে।

৩. পানামা খাল: প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করা এই খাল দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। উচ্চমূল্যের কার্গো, গাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ কন্টেইনার পণ্য এই পথেই পরিবহন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই খালের কার্যকারিতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে খালের মিঠা পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল সীমিত করতে হয়েছে।

৪. মালাক্কা প্রণালি: বিশ্বের ব্যস্ততম এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ ও তেলের ১০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এটি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী; এমনকি চীনের ৮০ শতাংশ তেল এই পথেই আসে। তবে ২০২৫ সালে এখানে ১৩০টির বেশি জলদস্যুতার ঘটনা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই পথের প্রধান ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও এখানে প্রবল।

৫. তার্কিশ প্রণালি (বসফোরাস ও দার্দেনেলিস): কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সংযোগস্থল এটি, যা বিশ্ব গমের ২০ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। মাত্র ৭০০ মিটার চওড়া এই পথে জাহাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এখানে সামরিক জাহাজ চলাচল সীমিত থাকলেও বাণিজ্যিক পথটি খোলা রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব শস্য বাজারে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬


বিশ্ব বাণিজ্যের ভাগ্য নির্ধারক যে ৫টি সরু সমুদ্রপথ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। এই সংকট বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে এনেছে—তা হলো মাত্র কয়েকটি সরু সমুদ্রপথ বা ‘বটলনেক’-এর ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির চরম নির্ভরশীলতা।

১. হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ এটি, যা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরকে যুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ৩৯ শতাংশ এবং গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এখানে জাহাজ চলাচলে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন ও সার রপ্তানিকেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

২. সুয়েজ খাল: এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাত্রাপথ অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দেওয়া এই খাল দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এর দক্ষিণে অবস্থিত ‘বাব আল মানদাব’ প্রণালিতে হুথি গোষ্ঠীর হামলার কারণে জাহাজগুলো এখন আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২১ সালে একটি জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এই খালের গুরুত্ব ও ঝুঁকি উভয়ই স্পষ্ট করে।

৩. পানামা খাল: প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করা এই খাল দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। উচ্চমূল্যের কার্গো, গাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ কন্টেইনার পণ্য এই পথেই পরিবহন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই খালের কার্যকারিতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে খালের মিঠা পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল সীমিত করতে হয়েছে।

৪. মালাক্কা প্রণালি: বিশ্বের ব্যস্ততম এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ ও তেলের ১০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এটি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী; এমনকি চীনের ৮০ শতাংশ তেল এই পথেই আসে। তবে ২০২৫ সালে এখানে ১৩০টির বেশি জলদস্যুতার ঘটনা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই পথের প্রধান ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও এখানে প্রবল।

৫. তার্কিশ প্রণালি (বসফোরাস ও দার্দেনেলিস): কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সংযোগস্থল এটি, যা বিশ্ব গমের ২০ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। মাত্র ৭০০ মিটার চওড়া এই পথে জাহাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এখানে সামরিক জাহাজ চলাচল সীমিত থাকলেও বাণিজ্যিক পথটি খোলা রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব শস্য বাজারে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ