ঢাকা নিউজ

বাংলাদেশি জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' আটকে থাকার কারণ ও কূটনৈতিক জটিলতা



বাংলাদেশি জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' আটকে থাকার কারণ ও কূটনৈতিক জটিলতা
ছবি : সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' আটকে থাকার বিষয়টি বর্তমানে টালমাটাল মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএসসির মালিকানাধীন এই জাহাজটি ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা থাকলেও ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এটি পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই বাধার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:


১. বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিবৃতিতে ইরানের অসন্তুষ্টি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিগুলো তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে।

  • একতরফা নিন্দা: ১লা মার্চ বাংলাদেশের দেওয়া বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর 'সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের' নিন্দা জানানো হলেও, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

  • স্পষ্ট অবস্থানের অভাব: বিবৃতিতে হামলাকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করায় ইরান মনে করছে বাংলাদেশ তাদের প্রতি বন্ধুসুলভ বা নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়নি।

২. খামেনির মৃত্যুতে শোক পালনে 'উদাসীনতা'

২৮শে ফেব্রুয়ারি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের শোক জানানোর ধরন নিয়ে ইরান উষ্মা প্রকাশ করেছে।

  • ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর মতে, খামেনির মৃত্যুর পর যথাযথ শোক জানানো হয়নি এবং দূতাবাসে রক্ষিত শোক বইতে কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা স্বাক্ষর করতে যাননি। এই ঘটনাটিকে ইরান তাদের জন্য অবমাননাকর হিসেবে দেখছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও সার্বভৌমত্ব

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো যেকোনো দেশের ওপর আক্রমণের বিরোধিতা করা। কিন্তু এবার বাংলাদেশ যখন ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানালো অথচ ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে নীরব থাকলো, তখন একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণকে একটি 'কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করছে

  • অবস্থান: জাহাজটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে গভীর জলসীমায় অবস্থান করছে।

  • তৎপরতা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে ঢাকার রাষ্ট্রদূতকেও বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

  • আশা: বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন যে, কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে এবং দ্রুতই জাহাজটি ছাড়পত্র পাবে বলে তারা আশাবাদী।

এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে তার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অবস্থানটি ইরানের কাছে আরও জোরালোভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬


বাংলাদেশি জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' আটকে থাকার কারণ ও কূটনৈতিক জটিলতা

প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' আটকে থাকার বিষয়টি বর্তমানে টালমাটাল মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএসসির মালিকানাধীন এই জাহাজটি ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা থাকলেও ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এটি পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই বাধার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:


১. বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিবৃতিতে ইরানের অসন্তুষ্টি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিগুলো তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে।

  • একতরফা নিন্দা: ১লা মার্চ বাংলাদেশের দেওয়া বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর 'সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের' নিন্দা জানানো হলেও, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

  • স্পষ্ট অবস্থানের অভাব: বিবৃতিতে হামলাকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করায় ইরান মনে করছে বাংলাদেশ তাদের প্রতি বন্ধুসুলভ বা নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়নি।

২. খামেনির মৃত্যুতে শোক পালনে 'উদাসীনতা'

২৮শে ফেব্রুয়ারি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের শোক জানানোর ধরন নিয়ে ইরান উষ্মা প্রকাশ করেছে।

  • ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর মতে, খামেনির মৃত্যুর পর যথাযথ শোক জানানো হয়নি এবং দূতাবাসে রক্ষিত শোক বইতে কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা স্বাক্ষর করতে যাননি। এই ঘটনাটিকে ইরান তাদের জন্য অবমাননাকর হিসেবে দেখছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও সার্বভৌমত্ব

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো যেকোনো দেশের ওপর আক্রমণের বিরোধিতা করা। কিন্তু এবার বাংলাদেশ যখন ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানালো অথচ ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে নীরব থাকলো, তখন একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণকে একটি 'কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করছে

  • অবস্থান: জাহাজটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে গভীর জলসীমায় অবস্থান করছে।

  • তৎপরতা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে ঢাকার রাষ্ট্রদূতকেও বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

  • আশা: বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন যে, কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে এবং দ্রুতই জাহাজটি ছাড়পত্র পাবে বলে তারা আশাবাদী।

এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে তার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অবস্থানটি ইরানের কাছে আরও জোরালোভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ