দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অসময়ের তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহে পাকিস্তান ও ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই তীব্র তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের সরাসরি প্রভাব। বিশেষ করে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে এপ্রিল ও মে মাস জুড়ে তাপমাত্রা ৪৪ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোয় দুপুরের তীব্র গরমে সাধারণ মানুষ ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। একই সঙ্গে ভারতের রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্রসহ উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে রাজ্যগুলোতে স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পাকিস্তানের ঐতিহ্যগতভাবে সমুদ্রের বাতাসে শীতল থাকা করাচি শহরও এবার এই চরম আবহাওয়া থেকে রেহাই পায়নি। মে মাসের প্রথমার্ধেই করাচির তাপমাত্রা একাধিকবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সম্প্রতি করাচিতে সর্বোচ্চ ৪৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের পর শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। করাচির উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং তীব্র পানির সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রচণ্ড গরমে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং তাদের জরুরি চিকিৎসার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
করাচির বাসিন্দাদের মনে এখনো ২০১৫ সালের ভয়াবহ দাবদাহের স্মৃতি দগদগে, যখন শহরজুড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালেও হিটস্ট্রোকে অনেকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। এই তীব্র গরমের প্রভাব এখন স্থানীয় হাসপাতালগুলোতেও স্পষ্ট। করাচির উপকূলীয় এলাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা, বিশেষ করে শিশুদের ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু আসত, এখন তা দৈনিক ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগই ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ এবং অতিরিক্ত ডিহাইড্রেশনের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে, যার মূল কারণ প্রচণ্ড গরম এবং অনিরাপদ পানির ব্যবহার।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে এই তীব্র দাবদাহ এখন একটি স্থায়ী ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ নামক সংস্থার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরণের চরম দাবদাহের আশঙ্কা প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে। পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, করাচিতে আর্দ্রতার কারণে তাপমাত্রা যতটুকু, অনুভূত হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। একই সঙ্গে আগের তুলনায় এখন রাতের তাপমাত্রাও অনেক বেশি থাকছে, যা মানুষের ঘুম ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। পর্যাপ্ত গাছপালার অভাব এবং শহরজুড়ে শীতলীকরণ কেন্দ্রের অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বিগত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং কেবল সিন্ধু প্রদেশেই এই বৃদ্ধির হার ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে শীতকাল ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে এবং গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ, তীব্র ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে গণ-শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক হারে নগর বনায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অসময়ের তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহে পাকিস্তান ও ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই তীব্র তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের সরাসরি প্রভাব। বিশেষ করে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে এপ্রিল ও মে মাস জুড়ে তাপমাত্রা ৪৪ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোয় দুপুরের তীব্র গরমে সাধারণ মানুষ ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। একই সঙ্গে ভারতের রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্রসহ উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে রাজ্যগুলোতে স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পাকিস্তানের ঐতিহ্যগতভাবে সমুদ্রের বাতাসে শীতল থাকা করাচি শহরও এবার এই চরম আবহাওয়া থেকে রেহাই পায়নি। মে মাসের প্রথমার্ধেই করাচির তাপমাত্রা একাধিকবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সম্প্রতি করাচিতে সর্বোচ্চ ৪৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের পর শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। করাচির উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং তীব্র পানির সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রচণ্ড গরমে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং তাদের জরুরি চিকিৎসার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
করাচির বাসিন্দাদের মনে এখনো ২০১৫ সালের ভয়াবহ দাবদাহের স্মৃতি দগদগে, যখন শহরজুড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালেও হিটস্ট্রোকে অনেকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। এই তীব্র গরমের প্রভাব এখন স্থানীয় হাসপাতালগুলোতেও স্পষ্ট। করাচির উপকূলীয় এলাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা, বিশেষ করে শিশুদের ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু আসত, এখন তা দৈনিক ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগই ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ এবং অতিরিক্ত ডিহাইড্রেশনের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে, যার মূল কারণ প্রচণ্ড গরম এবং অনিরাপদ পানির ব্যবহার।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে এই তীব্র দাবদাহ এখন একটি স্থায়ী ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ নামক সংস্থার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরণের চরম দাবদাহের আশঙ্কা প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে। পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, করাচিতে আর্দ্রতার কারণে তাপমাত্রা যতটুকু, অনুভূত হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। একই সঙ্গে আগের তুলনায় এখন রাতের তাপমাত্রাও অনেক বেশি থাকছে, যা মানুষের ঘুম ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। পর্যাপ্ত গাছপালার অভাব এবং শহরজুড়ে শীতলীকরণ কেন্দ্রের অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বিগত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং কেবল সিন্ধু প্রদেশেই এই বৃদ্ধির হার ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে শীতকাল ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে এবং গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ, তীব্র ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে গণ-শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক হারে নগর বনায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন