ঢাকা নিউজ

কমলার হারের ‘ময়নাতদন্ত’ রিপোর্টে একগুচ্ছ ভুল ও গাজা ইস্যু এড়ানোর প্রমাণ



কমলার হারের ‘ময়নাতদন্ত’ রিপোর্টে একগুচ্ছ ভুল ও গাজা ইস্যু এড়ানোর প্রমাণ
ছবি : সংগৃহীত

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের শোচনীয় পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অটোপ্সি রিপোর্ট’ বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় ও মানবাধিকার কর্মীদের চাপের মুখে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) এই ১৯২ পৃষ্ঠার পর্যালোচনা নথিটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তবে জনসমক্ষে আসা এই প্রতিবেদনে অসংখ্য ভুলত্রুটি, খামতি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থিতি দেখা গেছে, এমনকি মার্কিন রাজনীতি ও বিশ্বমঞ্চে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করা গাজা যুদ্ধ ও ইসরাইল নীতির মতো সংবেদনশীল বিষয়টিও এই পুরো প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ডিএনসি চেয়ারম্যান কেন মার্টিন রিপোর্টের দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতার কথা অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন, এই প্রতিবেদনটি কারোর মানদণ্ডই পূরণ করতে পারেনি এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই এটি অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশ করা হয়েছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে ৫টি মূল বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, গাজা প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিস প্রশাসনের ইসরাইলপন্থী একমুখী নীতি, গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা এবং জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো প্রদানের বিষয়টি প্রগতিশীল ও তরুণ ভোটারদের বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করেছিল, যা কমলার জনপ্রিয়তায় ধস নামায়। অথচ দীর্ঘ এই রিপোর্টে ‘গাজা’ বা ‘ইসরাইল’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই; যদিও কমলার ডেপুটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজার রব ফ্লাহার্টি পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে গাজা ইস্যুটি তাদের প্রচার শিবিরের গলায় একটি ‘পচা মাছের’ মতো ঝুলে ছিল।

দ্বিতীয়ত, প্রতিবেদনটিতে নিখোঁজ অংশ, ভুল তথ্য ও অসংখ্য বৈপরীত্যের টীকা-টিপ্পনী দেখা গেছে। এটি এতটাই তাড়াহুড়ো করে তৈরি যে এর ‘এক্সিকিউটিভ সামারি’ ও ‘কনক্লুশন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো গায়েব করে কেবল ‘পেন্ডিং’ লিখে রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটরা তিনটি গভর্নর পদে জিতলেও রিপোর্টে দুটি উল্লেখ করা এবং মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া ও উইসকনসিনকে নিশ্চিত ঘাঁটি দাবি করার মতো ভুল তথ্য রয়েছে, অথচ ২০১৬ সালে এই রাজ্যগুলোতেই ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। রিপোর্টের এই ত্রুটিগুলোর পাশে ডিএনসি-র পক্ষ থেকে ‘দাবিটি যাচাই করা যায়নি’ বা ‘প্রকাশিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক’ এমন অসংখ্য টীকা জুড়ে দিতে হয়েছে।

তৃতীয়ত, রিপোর্টে জো বাইডেনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাবের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জো বাইডেনের হোয়াইট হাউস কমলা হ্যারিসকে রাজনৈতিকভাবে গড়ে তুলতে বা কৌশলগত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেনের প্রচারণায় নামার বিষয়ে বিস্তর জরিপ ও গবেষণা করা হলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলার ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করা হয়নি। উপরন্তু, কমলার ওপর অভিবাসনের মূল কারণ অনুসন্ধানের মতো একটি বিতর্কিত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ায় রিপাবলিকানরা সহজেই তাকে ‘বর্ডার জার’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করার সুযোগ পায়।

চতুর্থত, হ্যারিস শিবিরের ‘শুধু ট্রাম্প-বিরোধী’ কৌশলের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে। কমলা হ্যারিসের প্রচার শিবিরের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল মার্কিন জনগণের সামনে নিজেদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরতে না পারা। তাদের পুরো প্রচারণা আবর্তিত হয়েছে ‘ট্রাম্পকে ঠেকাতে হবে’ এবং ‘অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনজীবী’— এই সরল সমীকরণকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের অধীনে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত সাধারণ ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের অতীত ব্যর্থতা তুলে ধরার এই চেনা নেতিবাচক দিকগুলো ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেনি।

পঞ্চমত, ট্রান্সজেন্ডার বিজ্ঞাপনে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েন কমলা। নির্বাচনী প্রচারণার শেষলগ্নে ট্রাম্প শিবিরের একটি অত্যন্ত কার্যকর বিজ্ঞাপন কমলার প্রচারণাকে আঘাত করে, যেখানে কারাবন্দী ট্রান্সজেন্ডারদের রাষ্ট্রীয় খরচে লিঙ্গ পরিবর্তন অস্ত্রোপচারের সুবিধা দেওয়ার পক্ষে কমলার একটি পুরনো বক্তব্যকে ব্যবহার করে স্লোগান দেওয়া হয়— ‘কমলা তাদের জন্য, আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনার জন্য।’ ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ জরিপকারীরাও স্বীকার করেছেন, এই একটি বিজ্ঞাপন কমলার অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকারকে ভোটারদের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল এবং কমলা নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করায় এর কোনো মানানসই জবাব ডেমোক্র্যাটরা দিতে পারেনি।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


কমলার হারের ‘ময়নাতদন্ত’ রিপোর্টে একগুচ্ছ ভুল ও গাজা ইস্যু এড়ানোর প্রমাণ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের শোচনীয় পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অটোপ্সি রিপোর্ট’ বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় ও মানবাধিকার কর্মীদের চাপের মুখে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) এই ১৯২ পৃষ্ঠার পর্যালোচনা নথিটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তবে জনসমক্ষে আসা এই প্রতিবেদনে অসংখ্য ভুলত্রুটি, খামতি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থিতি দেখা গেছে, এমনকি মার্কিন রাজনীতি ও বিশ্বমঞ্চে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করা গাজা যুদ্ধ ও ইসরাইল নীতির মতো সংবেদনশীল বিষয়টিও এই পুরো প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ডিএনসি চেয়ারম্যান কেন মার্টিন রিপোর্টের দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতার কথা অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন, এই প্রতিবেদনটি কারোর মানদণ্ডই পূরণ করতে পারেনি এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই এটি অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশ করা হয়েছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে ৫টি মূল বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, গাজা প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিস প্রশাসনের ইসরাইলপন্থী একমুখী নীতি, গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা এবং জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো প্রদানের বিষয়টি প্রগতিশীল ও তরুণ ভোটারদের বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করেছিল, যা কমলার জনপ্রিয়তায় ধস নামায়। অথচ দীর্ঘ এই রিপোর্টে ‘গাজা’ বা ‘ইসরাইল’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই; যদিও কমলার ডেপুটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজার রব ফ্লাহার্টি পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে গাজা ইস্যুটি তাদের প্রচার শিবিরের গলায় একটি ‘পচা মাছের’ মতো ঝুলে ছিল।

দ্বিতীয়ত, প্রতিবেদনটিতে নিখোঁজ অংশ, ভুল তথ্য ও অসংখ্য বৈপরীত্যের টীকা-টিপ্পনী দেখা গেছে। এটি এতটাই তাড়াহুড়ো করে তৈরি যে এর ‘এক্সিকিউটিভ সামারি’ ও ‘কনক্লুশন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো গায়েব করে কেবল ‘পেন্ডিং’ লিখে রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটরা তিনটি গভর্নর পদে জিতলেও রিপোর্টে দুটি উল্লেখ করা এবং মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া ও উইসকনসিনকে নিশ্চিত ঘাঁটি দাবি করার মতো ভুল তথ্য রয়েছে, অথচ ২০১৬ সালে এই রাজ্যগুলোতেই ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। রিপোর্টের এই ত্রুটিগুলোর পাশে ডিএনসি-র পক্ষ থেকে ‘দাবিটি যাচাই করা যায়নি’ বা ‘প্রকাশিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক’ এমন অসংখ্য টীকা জুড়ে দিতে হয়েছে।

তৃতীয়ত, রিপোর্টে জো বাইডেনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাবের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জো বাইডেনের হোয়াইট হাউস কমলা হ্যারিসকে রাজনৈতিকভাবে গড়ে তুলতে বা কৌশলগত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেনের প্রচারণায় নামার বিষয়ে বিস্তর জরিপ ও গবেষণা করা হলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলার ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করা হয়নি। উপরন্তু, কমলার ওপর অভিবাসনের মূল কারণ অনুসন্ধানের মতো একটি বিতর্কিত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ায় রিপাবলিকানরা সহজেই তাকে ‘বর্ডার জার’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করার সুযোগ পায়।

চতুর্থত, হ্যারিস শিবিরের ‘শুধু ট্রাম্প-বিরোধী’ কৌশলের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে। কমলা হ্যারিসের প্রচার শিবিরের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল মার্কিন জনগণের সামনে নিজেদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরতে না পারা। তাদের পুরো প্রচারণা আবর্তিত হয়েছে ‘ট্রাম্পকে ঠেকাতে হবে’ এবং ‘অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনজীবী’— এই সরল সমীকরণকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের অধীনে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত সাধারণ ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের অতীত ব্যর্থতা তুলে ধরার এই চেনা নেতিবাচক দিকগুলো ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেনি।

পঞ্চমত, ট্রান্সজেন্ডার বিজ্ঞাপনে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েন কমলা। নির্বাচনী প্রচারণার শেষলগ্নে ট্রাম্প শিবিরের একটি অত্যন্ত কার্যকর বিজ্ঞাপন কমলার প্রচারণাকে আঘাত করে, যেখানে কারাবন্দী ট্রান্সজেন্ডারদের রাষ্ট্রীয় খরচে লিঙ্গ পরিবর্তন অস্ত্রোপচারের সুবিধা দেওয়ার পক্ষে কমলার একটি পুরনো বক্তব্যকে ব্যবহার করে স্লোগান দেওয়া হয়— ‘কমলা তাদের জন্য, আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনার জন্য।’ ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ জরিপকারীরাও স্বীকার করেছেন, এই একটি বিজ্ঞাপন কমলার অর্থনৈতিক নীতি ও অগ্রাধিকারকে ভোটারদের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল এবং কমলা নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করায় এর কোনো মানানসই জবাব ডেমোক্র্যাটরা দিতে পারেনি।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ