আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনে মেতেছে রাশিয়া ও তার অন্যতম প্রধান মিত্র বেলারুশ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সামরিক মহড়া পরিচালনা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও লুকাশেঙ্কো। শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিনের এই অংশগ্রহণ ন্যাটোর সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই রাশিয়ার পক্ষ থেকে বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র পাঠানো এবং এই যৌথ মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল জাজিরার তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ রয়েছে:
১. পশ্চিমাদের ভয় দেখানো ও ন্যাটোর ওপর চাপ সৃষ্টি সুইডেনের হেলসিংবার্গে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শীর্ষ সম্মেলনকে লক্ষ্য করেই রাশিয়া ও বেলারুশ এই মহড়ার সময় নির্ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহড়ার অংশ হিসেবে ‘ইয়ার্স’ নামক আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়, যা মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫,৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া মস্কো বেলারুশকে আধুনিকায়িত এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান এবং ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে আসিপোভিচি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার এই পারমাণবিক অস্ত্রগুলো মজুত রাখা হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক এই পদক্ষেপকে পশ্চিমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাশিয়ার ‘অস্ত্রের ঝনঝনানি’ বা ফাঁকা আওয়াজ বলে অভিহিত করেছেন। ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুট অবশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত বিধ্বংসী।
২. ইউক্রেনকে নতুন করে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল এবং রাজধানী কিয়েভে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর অংশ হিসেবেই রাশিয়া বেলারুশকে এই আগ্রাসনে টেনে আনছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বেলারুশে অবস্থানরত রুশ সেনাবহর নতুন কোনো আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কিয়েভ-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া লুকাশেঙ্কোর জন্য আত্মঘাতী হবে এবং তিনি এই ঝুঁকি এড়াতে চাইবেন। কূটনিতিকদের মতে, এই উত্তেজনার আড়ালে কিয়েভ ও মিনস্কের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি ভিন্ন কৌশলও থাকতে পারে।
৩. লুকাশেঙ্কোর ভারসাম্য রক্ষার জটিল রাজনৈতিক চাল বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরাচার’ হিসেবে পরিচিত লুকাশেঙ্কো রাশিয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়েও নিজের সব রাজনৈতিক গুটি এক চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও পুতিনের সঙ্গে বেলারুশকে একীভূত করার প্রচেষ্টা তিনি বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। উপরন্তু, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেলারুশের সম্পর্কের একধরনের উষ্ণতাও দেখা গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেলারুশের ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে লুকাশেঙ্কো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে সংলাপের চেষ্টা করছেন।
মহড়ার পর এক বিবৃতিতে ৭১ বছর বয়সি বেলারুশীয় প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো জানান, তারা কাউকে হুমকি দিচ্ছেন না, তবে যেকোনো মূল্যে বেলারুশের ব্রেস্ট থেকে রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত বিস্তৃত অভিন্ন পিতৃভূমি রক্ষা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, পর্দার আড়ালে বড় কিছু একটা ঘটছে যা বিশ্বরাজনীতি ও গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। একনায়কদের সিদ্ধান্ত সবসময়ই অনিশ্চিত হওয়ায়, বেলারুশের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষীণ ঝুঁকি এখনো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনে মেতেছে রাশিয়া ও তার অন্যতম প্রধান মিত্র বেলারুশ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সামরিক মহড়া পরিচালনা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও লুকাশেঙ্কো। শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিনের এই অংশগ্রহণ ন্যাটোর সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই রাশিয়ার পক্ষ থেকে বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র পাঠানো এবং এই যৌথ মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল জাজিরার তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ রয়েছে:
১. পশ্চিমাদের ভয় দেখানো ও ন্যাটোর ওপর চাপ সৃষ্টি সুইডেনের হেলসিংবার্গে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শীর্ষ সম্মেলনকে লক্ষ্য করেই রাশিয়া ও বেলারুশ এই মহড়ার সময় নির্ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহড়ার অংশ হিসেবে ‘ইয়ার্স’ নামক আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়, যা মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫,৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া মস্কো বেলারুশকে আধুনিকায়িত এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান এবং ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে আসিপোভিচি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার এই পারমাণবিক অস্ত্রগুলো মজুত রাখা হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক এই পদক্ষেপকে পশ্চিমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাশিয়ার ‘অস্ত্রের ঝনঝনানি’ বা ফাঁকা আওয়াজ বলে অভিহিত করেছেন। ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুট অবশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত বিধ্বংসী।
২. ইউক্রেনকে নতুন করে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল এবং রাজধানী কিয়েভে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর অংশ হিসেবেই রাশিয়া বেলারুশকে এই আগ্রাসনে টেনে আনছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বেলারুশে অবস্থানরত রুশ সেনাবহর নতুন কোনো আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কিয়েভ-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া লুকাশেঙ্কোর জন্য আত্মঘাতী হবে এবং তিনি এই ঝুঁকি এড়াতে চাইবেন। কূটনিতিকদের মতে, এই উত্তেজনার আড়ালে কিয়েভ ও মিনস্কের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি ভিন্ন কৌশলও থাকতে পারে।
৩. লুকাশেঙ্কোর ভারসাম্য রক্ষার জটিল রাজনৈতিক চাল বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরাচার’ হিসেবে পরিচিত লুকাশেঙ্কো রাশিয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়েও নিজের সব রাজনৈতিক গুটি এক চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও পুতিনের সঙ্গে বেলারুশকে একীভূত করার প্রচেষ্টা তিনি বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। উপরন্তু, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেলারুশের সম্পর্কের একধরনের উষ্ণতাও দেখা গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেলারুশের ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে লুকাশেঙ্কো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে সংলাপের চেষ্টা করছেন।
মহড়ার পর এক বিবৃতিতে ৭১ বছর বয়সি বেলারুশীয় প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো জানান, তারা কাউকে হুমকি দিচ্ছেন না, তবে যেকোনো মূল্যে বেলারুশের ব্রেস্ট থেকে রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত বিস্তৃত অভিন্ন পিতৃভূমি রক্ষা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, পর্দার আড়ালে বড় কিছু একটা ঘটছে যা বিশ্বরাজনীতি ও গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। একনায়কদের সিদ্ধান্ত সবসময়ই অনিশ্চিত হওয়ায়, বেলারুশের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষীণ ঝুঁকি এখনো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আপনার মতামত লিখুন