১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকেই কিউবা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ। সম্প্রতি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, ট্রাম্প প্রশাসন এবার কমিউনিস্ট-শাসিত কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। তবে কারাকাস (ভেনিজুয়েলা) হাভানার অন্যতম প্রধান সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও, কিউবা কেন আরেকটি ‘ভেনিজুয়েলা’ হয়ে উঠবে না—তার একটি কৌশলগত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
ভেনিজুয়েলায় গত ৩ জানুয়ারি এক ঝটিকা অভিযানে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্ব নেন এবং বর্তমানে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল কিংবা সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সি রাউল কাস্ত্রোর এমন কোনো নির্দিষ্ট ডেপুটি নেই। ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের ইউএস-ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজ বলেন, কিউবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং তারা বিকল্প যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে পদ্ধতিগতভাবেই উপড়ে ফেলেছে। এছাড়া ভেনিজুয়েলায় মারিয়া করিনা মাচাদোর মতো একজন জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা থাকলেও কিউবায় এমন কোনো বিকল্প জননেতা নেই।
কিউবার সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক এবং ঐক্যবদ্ধ, যার ফলে তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর নিরাপত্তা দেওয়ার সময় বেশ কয়েকজন কিউবান এজেন্ট নিহত হলেও, যারা বেঁচে ফিরেছেন তারা মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধকৌশল খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এছাড়া রাশিয়া ও চীনের সাথে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ফলে কিউবার গোয়েন্দা ও নজরদারি প্রযুক্তি বেশ উন্নত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিউবায় অস্থিরতা তৈরি হলে তা বড় ধরনের অভিবাসন সংকট তৈরি করতে পারে এবং যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা শুরু হলে মানুষ দলে দলে দেশ ছেড়ে পালাতে পারে।
ভেনিজুয়েলা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং দেশটির তেল উত্তোলনের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু কিউবার এমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি, মার্কিন অবরোধ ও তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে এমনিতেই কিউবার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর ওপর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত পর্যটন শিল্প ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় মান ও মূল্যের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। ফলে কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিকভাবে পাওয়ার কিছু নেই।
রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা: ১৯৯৬ সালের ‘হেলমস-বার্টন অ্যাক্ট’ বা আইনের কারণে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হাত অনেকটাই বাঁধা। এ আইন অনুযায়ী, কিউবায় একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠনসহ সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তন না এলে কয়েক দশকের পুরোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। কিউবার পুরো অর্থনীতি মূলত ‘গায়েসা’ নামের একটি সামরিক জোটের নিয়ন্ত্রণে, যার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্রটির শীর্ষ হোটেল, প্রধান বন্দর, সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সুপারমার্কেটগুলো এ সামরিক জোটই পরিচালনা করে।
সর্বোপরি, ভেনিজুয়েলায় অভিযানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু কিউবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ নেই, বরং মাদক পাচার রোধে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সহযোগিতা করে আসছে বলে দাবি হাভানার। তাই ইরানে প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বিশাল বাজেট ঘাটতির মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিউবায় হাত দেওয়া বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকেই কিউবা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ। সম্প্রতি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, ট্রাম্প প্রশাসন এবার কমিউনিস্ট-শাসিত কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। তবে কারাকাস (ভেনিজুয়েলা) হাভানার অন্যতম প্রধান সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও, কিউবা কেন আরেকটি ‘ভেনিজুয়েলা’ হয়ে উঠবে না—তার একটি কৌশলগত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
ভেনিজুয়েলায় গত ৩ জানুয়ারি এক ঝটিকা অভিযানে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্ব নেন এবং বর্তমানে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল কিংবা সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সি রাউল কাস্ত্রোর এমন কোনো নির্দিষ্ট ডেপুটি নেই। ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের ইউএস-ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজ বলেন, কিউবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং তারা বিকল্প যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে পদ্ধতিগতভাবেই উপড়ে ফেলেছে। এছাড়া ভেনিজুয়েলায় মারিয়া করিনা মাচাদোর মতো একজন জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা থাকলেও কিউবায় এমন কোনো বিকল্প জননেতা নেই।
কিউবার সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক এবং ঐক্যবদ্ধ, যার ফলে তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর নিরাপত্তা দেওয়ার সময় বেশ কয়েকজন কিউবান এজেন্ট নিহত হলেও, যারা বেঁচে ফিরেছেন তারা মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধকৌশল খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এছাড়া রাশিয়া ও চীনের সাথে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ফলে কিউবার গোয়েন্দা ও নজরদারি প্রযুক্তি বেশ উন্নত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিউবায় অস্থিরতা তৈরি হলে তা বড় ধরনের অভিবাসন সংকট তৈরি করতে পারে এবং যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা শুরু হলে মানুষ দলে দলে দেশ ছেড়ে পালাতে পারে।
ভেনিজুয়েলা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং দেশটির তেল উত্তোলনের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু কিউবার এমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি, মার্কিন অবরোধ ও তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে এমনিতেই কিউবার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর ওপর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত পর্যটন শিল্প ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় মান ও মূল্যের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। ফলে কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিকভাবে পাওয়ার কিছু নেই।
রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা: ১৯৯৬ সালের ‘হেলমস-বার্টন অ্যাক্ট’ বা আইনের কারণে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হাত অনেকটাই বাঁধা। এ আইন অনুযায়ী, কিউবায় একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠনসহ সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তন না এলে কয়েক দশকের পুরোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। কিউবার পুরো অর্থনীতি মূলত ‘গায়েসা’ নামের একটি সামরিক জোটের নিয়ন্ত্রণে, যার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্রটির শীর্ষ হোটেল, প্রধান বন্দর, সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সুপারমার্কেটগুলো এ সামরিক জোটই পরিচালনা করে।
সর্বোপরি, ভেনিজুয়েলায় অভিযানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু কিউবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ নেই, বরং মাদক পাচার রোধে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সহযোগিতা করে আসছে বলে দাবি হাভানার। তাই ইরানে প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বিশাল বাজেট ঘাটতির মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিউবায় হাত দেওয়া বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন