গত ২১ মে চীন ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠানের পর, ২৩ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে বেইজিংয়ে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গেছেন। আনুষ্ঠানিক উদযাপনে ‘লৌহ ভাই’ বা ‘সব আবহাওয়ার বন্ধু’র মতো শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হলেও, এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পেছনে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, বিতর্কিত ভূখণ্ড হস্তান্তর, গোপন পরমাণু সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে উভয়ের যৌথ শত্রুতা।
১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে বেইজিংকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ভারসাম্য তৈরি করার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা থেকেই ইসলামাবাদের এই পদক্ষেপ ছিল।
এই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৬৩ সালের মার্চে, যখন পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেপথ্য ভূমিকায় পাকিস্তান কারাকোরাম পর্বতমালার অন্তর্গত প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা (শাকসগাম উপত্যকা) চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের জয়ের পরপরই এই চুক্তি হয়। বিতর্কিত পর্বতাঞ্চলের ওপর এককভাবে ভারতের দাবির মোকাবিলা করার চেয়ে সেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকাকেই তৎকালীন পাকিস্তানি নেতৃত্ব বেশি যৌক্তিক মনে করেছিল।
চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের দ্বিতীয় বড় ভিত্তি হলো তাদের পরমাণু সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে ভারত যখন প্রথম পরমাণু পরীক্ষা (পোখরান-১) চালায়, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যেকোনো মূল্যে পাল্টা সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীন পাকিস্তানকে অস্ত্রের নকশা এবং অন্তত দুটি পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করেছিল, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় দেশই তা অস্বীকার করে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে পাকিস্তান যখন চাগাইতে পাল্টা পরমাণু পরীক্ষা চালায়, তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনা নিন্দা প্রস্তাবে বাধা দিয়েছিল চীন।
বর্তমানে পাকিস্তানের পুরো সামরিক ইকোসিস্টেম চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই এখন সরবরাহ করে চীন। যৌথভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার ফাইটার জেট থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ফ্রিগেট এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সবই এই সহযোগিতার অংশ। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এক সামরিক সংঘাতের সময় চীনা যুদ্ধাস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর যৌথ উৎপাদন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। তবে সেই সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি বেইজিং নয়, বরং ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় হয়েছিল; কারণ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের কারণে চীন কখনোই দক্ষিণ এশিয়ায় একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে না।
চীন ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রকাশ হলো ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপেক)। ২০১৫ সালের এপ্রিলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ইসলামাবাদ সফরের সময় ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের কাশগড়কে আরব সাগরের গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে বেইজিংকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার প্রথম স্থলপথ দেয়। এর আগে ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কারাকোরাম হাইওয়ে এই সংযোগের প্রাথমিক ভিত্তি ছিল।
নিরাপত্তা সংকট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ: ২০১৬ সালের শেষের দিক থেকেই সিপেক প্রকল্পের দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান সময়ে এই প্রকল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সিপেক প্রকল্পের বিভিন্ন সাইটে চীনা নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা বেইজিংকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি গোয়াদরসহ পুরো বেলুচিস্তানে সমন্বিত হামলা চালায়। ২০২১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক পাকিস্তানে বিভিন্ন হামলায় নিহত হয়েছেন।
চলতি ২০২৬ সালের ১৪ মে পাকিস্তান চীনের অভ্যন্তরীণ পুঁজি বাজারে তাদের প্রথম ‘পান্ডা বন্ড’ (যার মূল্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার) ইস্যু করেছে, যা দুই দেশের আর্থিক কাঠামোর গভীর সংযোগকে নির্দেশ করে। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঋণের পাহাড়, চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে চীন-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য সমীকরণ বদলানোর মতো বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই তাদের ৭৫ বছরের এই ‘আয়রন ব্রাদার্স’ সম্পর্ককে সামনের দিনগুলোতে এগিয়ে যেতে হবে।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
গত ২১ মে চীন ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠানের পর, ২৩ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে বেইজিংয়ে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গেছেন। আনুষ্ঠানিক উদযাপনে ‘লৌহ ভাই’ বা ‘সব আবহাওয়ার বন্ধু’র মতো শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হলেও, এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পেছনে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, বিতর্কিত ভূখণ্ড হস্তান্তর, গোপন পরমাণু সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে উভয়ের যৌথ শত্রুতা।
১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে বেইজিংকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ভারসাম্য তৈরি করার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা থেকেই ইসলামাবাদের এই পদক্ষেপ ছিল।
এই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৬৩ সালের মার্চে, যখন পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেপথ্য ভূমিকায় পাকিস্তান কারাকোরাম পর্বতমালার অন্তর্গত প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা (শাকসগাম উপত্যকা) চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের জয়ের পরপরই এই চুক্তি হয়। বিতর্কিত পর্বতাঞ্চলের ওপর এককভাবে ভারতের দাবির মোকাবিলা করার চেয়ে সেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকাকেই তৎকালীন পাকিস্তানি নেতৃত্ব বেশি যৌক্তিক মনে করেছিল।
চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের দ্বিতীয় বড় ভিত্তি হলো তাদের পরমাণু সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে ভারত যখন প্রথম পরমাণু পরীক্ষা (পোখরান-১) চালায়, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যেকোনো মূল্যে পাল্টা সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীন পাকিস্তানকে অস্ত্রের নকশা এবং অন্তত দুটি পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করেছিল, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় দেশই তা অস্বীকার করে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে পাকিস্তান যখন চাগাইতে পাল্টা পরমাণু পরীক্ষা চালায়, তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনা নিন্দা প্রস্তাবে বাধা দিয়েছিল চীন।
বর্তমানে পাকিস্তানের পুরো সামরিক ইকোসিস্টেম চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই এখন সরবরাহ করে চীন। যৌথভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার ফাইটার জেট থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ফ্রিগেট এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সবই এই সহযোগিতার অংশ। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এক সামরিক সংঘাতের সময় চীনা যুদ্ধাস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর যৌথ উৎপাদন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। তবে সেই সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি বেইজিং নয়, বরং ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় হয়েছিল; কারণ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের কারণে চীন কখনোই দক্ষিণ এশিয়ায় একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে না।
চীন ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রকাশ হলো ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপেক)। ২০১৫ সালের এপ্রিলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ইসলামাবাদ সফরের সময় ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের কাশগড়কে আরব সাগরের গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে বেইজিংকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার প্রথম স্থলপথ দেয়। এর আগে ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কারাকোরাম হাইওয়ে এই সংযোগের প্রাথমিক ভিত্তি ছিল।
নিরাপত্তা সংকট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ: ২০১৬ সালের শেষের দিক থেকেই সিপেক প্রকল্পের দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান সময়ে এই প্রকল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সিপেক প্রকল্পের বিভিন্ন সাইটে চীনা নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা বেইজিংকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি গোয়াদরসহ পুরো বেলুচিস্তানে সমন্বিত হামলা চালায়। ২০২১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক পাকিস্তানে বিভিন্ন হামলায় নিহত হয়েছেন।
চলতি ২০২৬ সালের ১৪ মে পাকিস্তান চীনের অভ্যন্তরীণ পুঁজি বাজারে তাদের প্রথম ‘পান্ডা বন্ড’ (যার মূল্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার) ইস্যু করেছে, যা দুই দেশের আর্থিক কাঠামোর গভীর সংযোগকে নির্দেশ করে। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঋণের পাহাড়, চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে চীন-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য সমীকরণ বদলানোর মতো বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই তাদের ৭৫ বছরের এই ‘আয়রন ব্রাদার্স’ সম্পর্ককে সামনের দিনগুলোতে এগিয়ে যেতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন