ঢাকা নিউজ

মমতাকে আলটিমেটাম দিয়ে কল্যাণের তীব্র বিদ্রোহ



মমতাকে আলটিমেটাম দিয়ে কল্যাণের তীব্র বিদ্রোহ
ছবি : সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে ঘিরে। দলের বর্ষীয়ান নেতা ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে কার্যত ‘অভিষেক না আমি’— এমন আলটিমেটাম ছুড়ে দিয়েছেন দলনেত্রীর উদ্দেশে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এটা আমার জন্য চরম অপমান। অভিষেকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দলকে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রতিদিন সে নিজেকে রাজা মনে করে। দলের কঠিন সময়েও আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। কিন্তু অভিষেকের এই মনোভাবের কারণে আমার পক্ষে আর কাজ করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মমতাদিকেই আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি অভিষেককে ছাড়া দলকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আমি আর দলে থাকব না।’ রাজনৈতিক মহলে এই মন্তব্যকে তৃণমূল কংগ্রেসের চলমান সংকটের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, একটি জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীর দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশের পরই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। তিনি দাবি করেন, দ্বিতীয় একটি আবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে তাকে বদলানো হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে কলকাতা হাইকোর্ট অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিন সপ্তাহের জন্য গ্রেফতার থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়। একই সঙ্গে তাকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তদন্তকারীদের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাবে কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত।

এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকেই দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে। গত তিনটি নির্বাচনে ২০০-এর বেশি আসন পাওয়া দলটি এবার মাত্র ৮০টি আসনে জয় পেয়েছে। নির্বাচনি পরাজয়ের পর দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের গোপন দ্বন্দ্ব ও বিভাজন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দলের একাংশের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং দল ও প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্ব দেননি।

এরই মধ্যে তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদ দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতারাও রয়েছেন। তারা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

দলের সমালোচকদের অভিযোগ, তৃণমূলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আই-প্যাকের ভূমিকা এবং অভিষেকের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায়ও নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমাদের কথা কেউ শোনেনি। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছি, কিন্তু আমাদের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না। শুধু কিছু নির্বাচিত মানুষেরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূলে অনেক দুর্নীতি রয়েছে। এটা দেখে আমি হতাশ।’

দলের সংকট আরও গভীর হয়েছে একাধিক সাংসদের পদত্যাগে। এরই মধ্যে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেন প্রকাশ চিক বরাইক। এর আগে বুধবার পদত্যাগ করেন সুশ্মিতা দেব এবং সোমবার পদত্যাগ করেন সুখেন্দু শেখর রায়।

দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বিশ্বস্ত রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতে তিনি বরাবরই দলের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তবে এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্য অবস্থান তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বে গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীও অভিষেকের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তৃণমূলকে ধ্বংস করেছে অভিষেক। সে যা খুশি তাই করেছে।’ নির্বাচনি পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসে যে নেতৃত্ব সংকট ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


মমতাকে আলটিমেটাম দিয়ে কল্যাণের তীব্র বিদ্রোহ

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬

featured Image

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে ঘিরে। দলের বর্ষীয়ান নেতা ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে কার্যত ‘অভিষেক না আমি’— এমন আলটিমেটাম ছুড়ে দিয়েছেন দলনেত্রীর উদ্দেশে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এটা আমার জন্য চরম অপমান। অভিষেকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দলকে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রতিদিন সে নিজেকে রাজা মনে করে। দলের কঠিন সময়েও আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। কিন্তু অভিষেকের এই মনোভাবের কারণে আমার পক্ষে আর কাজ করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মমতাদিকেই আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি অভিষেককে ছাড়া দলকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আমি আর দলে থাকব না।’ রাজনৈতিক মহলে এই মন্তব্যকে তৃণমূল কংগ্রেসের চলমান সংকটের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, একটি জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীর দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশের পরই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। তিনি দাবি করেন, দ্বিতীয় একটি আবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে তাকে বদলানো হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে কলকাতা হাইকোর্ট অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিন সপ্তাহের জন্য গ্রেফতার থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়। একই সঙ্গে তাকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তদন্তকারীদের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাবে কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত।

এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকেই দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে। গত তিনটি নির্বাচনে ২০০-এর বেশি আসন পাওয়া দলটি এবার মাত্র ৮০টি আসনে জয় পেয়েছে। নির্বাচনি পরাজয়ের পর দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের গোপন দ্বন্দ্ব ও বিভাজন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দলের একাংশের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং দল ও প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্ব দেননি।

এরই মধ্যে তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদ দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতারাও রয়েছেন। তারা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

দলের সমালোচকদের অভিযোগ, তৃণমূলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আই-প্যাকের ভূমিকা এবং অভিষেকের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায়ও নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমাদের কথা কেউ শোনেনি। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছি, কিন্তু আমাদের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না। শুধু কিছু নির্বাচিত মানুষেরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূলে অনেক দুর্নীতি রয়েছে। এটা দেখে আমি হতাশ।’

দলের সংকট আরও গভীর হয়েছে একাধিক সাংসদের পদত্যাগে। এরই মধ্যে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেন প্রকাশ চিক বরাইক। এর আগে বুধবার পদত্যাগ করেন সুশ্মিতা দেব এবং সোমবার পদত্যাগ করেন সুখেন্দু শেখর রায়।

দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বিশ্বস্ত রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতে তিনি বরাবরই দলের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তবে এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্য অবস্থান তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বে গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীও অভিষেকের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তৃণমূলকে ধ্বংস করেছে অভিষেক। সে যা খুশি তাই করেছে।’ নির্বাচনি পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসে যে নেতৃত্ব সংকট ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ