ঢাকা নিউজ

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিমান যুদ্ধের চেনা সমীকরণ বদলাচ্ছে ইসরাইল



দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিমান যুদ্ধের চেনা সমীকরণ বদলাচ্ছে ইসরাইল
ছবি : সংগৃহীত

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় এবং পরবর্তীতে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে এক বিপজ্জনক সামরিক নজির স্থাপন করেছে। এই দুটি হামলার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—ইসরাইলি যুদ্ধবিমান লক্ষ্যবস্তু দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এই একক অপারেশনাল কৌশলটি শত্রু দেশের আকাশসীমায় প্রবেশের বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি দূর করে বিমান যুদ্ধের প্রধান সীমাবদ্ধতা মুছে দিয়েছে।

দোহা হামলাটি মূলত একটি কৌশলগত ভুল ছিল, কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য বসা হামাস নেতৃত্বের বৈঠককে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার মাধ্যমে ইসরাইলের নতুন সক্ষমতা অকারণে প্রকাশ পেয়ে যায়। এই অভিযানে কোনো প্রচলিত বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে একটি অত্যন্ত পরিপক্ক এবং সমন্বিত 'C7ISR' আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাইবার ও জ্ঞানীয় যুদ্ধকে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এখানে যুদ্ধবিমানটি মূল বিষয় ছিল না, বরং পুরো নেটওয়ার্ক সিস্টেমটিই ছিল মূল চালিকাশক্তি।

অভিযানের সময় একটি ইসরাইলি এফ-১৫আই যুদ্ধবিমান সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর থেকে ইসরাইলি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তর ভেদ করে মহাশূন্যের কাছাকাছি সাব-অরবিটাল ট্রাজেক্টোরিতে পৌঁছে গিয়ে সাধারণ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি তীব্র হাইপারসনিক গতিতে খাড়াভাবে বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় তীব্র তাপে তৈরি হওয়া প্লাজমা আবরণের কারণে শত্রুপক্ষের রাডারের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়, যার ফলে থাড বা প্যাট্রিয়টের মতো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এটিকে শনাক্ত বা ধ্বংস করার পর্যাপ্ত সময় পায় না।

তেহরানের হামলাটিতেও একই প্রযুক্তিগত কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছিল, তবে সেখানে সম্ভবত ব্লু স্প্যারো ভ্যারিয়েন্ট ব্যবহার করে এফ-১৫আই বিমানটি পূর্ব সিরিয়া বা পশ্চিম ইরাকের আকাশসীমা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরীক্ষার জন্য তৈরি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্রকে এখন আক্রমণের অস্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং এই স্ট্রাইক সিস্টেমটি এফ-১৫আই নামক একটি পুরনো যুদ্ধবিমানের সোর্স কোড ও মিশন সিস্টেমে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে, যার ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

সৌদি আরব বা কাতারের কাছে অত্যাধুনিক মার্কিন এফ-১৫ বহর থাকলেও তাদের এই স্তরের সোর্স কোড ব্যবহারের স্বাধীনতা নেই, যা উন্নত বিমান বাহিনীর প্রকৃত স্বাধীনতার ওপর প্রশ্ন তোলে। দোহা এবং তেহরানে এই সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসরাইল যে মডেলটি কার্যকর প্রমাণ করেছে, তা এখন আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য অনুকরণযোগ্য হয়ে উঠবে। এটি কার্যত মহাকাশ অস্ত্রায়নকে সাব-অরবিটাল পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে চিরচেনা ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও দূরত্বের কার্যকারিতাকে বিলুপ্ত করে যুদ্ধকে আরও অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক করে তুলছে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিমান যুদ্ধের চেনা সমীকরণ বদলাচ্ছে ইসরাইল

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় এবং পরবর্তীতে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে এক বিপজ্জনক সামরিক নজির স্থাপন করেছে। এই দুটি হামলার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—ইসরাইলি যুদ্ধবিমান লক্ষ্যবস্তু দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এই একক অপারেশনাল কৌশলটি শত্রু দেশের আকাশসীমায় প্রবেশের বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি দূর করে বিমান যুদ্ধের প্রধান সীমাবদ্ধতা মুছে দিয়েছে।

দোহা হামলাটি মূলত একটি কৌশলগত ভুল ছিল, কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য বসা হামাস নেতৃত্বের বৈঠককে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার মাধ্যমে ইসরাইলের নতুন সক্ষমতা অকারণে প্রকাশ পেয়ে যায়। এই অভিযানে কোনো প্রচলিত বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে একটি অত্যন্ত পরিপক্ক এবং সমন্বিত 'C7ISR' আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাইবার ও জ্ঞানীয় যুদ্ধকে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এখানে যুদ্ধবিমানটি মূল বিষয় ছিল না, বরং পুরো নেটওয়ার্ক সিস্টেমটিই ছিল মূল চালিকাশক্তি।

অভিযানের সময় একটি ইসরাইলি এফ-১৫আই যুদ্ধবিমান সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর থেকে ইসরাইলি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তর ভেদ করে মহাশূন্যের কাছাকাছি সাব-অরবিটাল ট্রাজেক্টোরিতে পৌঁছে গিয়ে সাধারণ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি তীব্র হাইপারসনিক গতিতে খাড়াভাবে বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় তীব্র তাপে তৈরি হওয়া প্লাজমা আবরণের কারণে শত্রুপক্ষের রাডারের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়, যার ফলে থাড বা প্যাট্রিয়টের মতো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এটিকে শনাক্ত বা ধ্বংস করার পর্যাপ্ত সময় পায় না।

তেহরানের হামলাটিতেও একই প্রযুক্তিগত কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছিল, তবে সেখানে সম্ভবত ব্লু স্প্যারো ভ্যারিয়েন্ট ব্যবহার করে এফ-১৫আই বিমানটি পূর্ব সিরিয়া বা পশ্চিম ইরাকের আকাশসীমা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরীক্ষার জন্য তৈরি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্রকে এখন আক্রমণের অস্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং এই স্ট্রাইক সিস্টেমটি এফ-১৫আই নামক একটি পুরনো যুদ্ধবিমানের সোর্স কোড ও মিশন সিস্টেমে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে, যার ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

সৌদি আরব বা কাতারের কাছে অত্যাধুনিক মার্কিন এফ-১৫ বহর থাকলেও তাদের এই স্তরের সোর্স কোড ব্যবহারের স্বাধীনতা নেই, যা উন্নত বিমান বাহিনীর প্রকৃত স্বাধীনতার ওপর প্রশ্ন তোলে। দোহা এবং তেহরানে এই সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসরাইল যে মডেলটি কার্যকর প্রমাণ করেছে, তা এখন আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য অনুকরণযোগ্য হয়ে উঠবে। এটি কার্যত মহাকাশ অস্ত্রায়নকে সাব-অরবিটাল পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে চিরচেনা ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও দূরত্বের কার্যকারিতাকে বিলুপ্ত করে যুদ্ধকে আরও অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক করে তুলছে।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ