পাশ্চাত্যে ইরানকে সাধারণত ইহুদি-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হলেও, দেশটির বুক চিরে রয়েছে প্রায় ২,৭০০ বছরের পুরোনো এক সমৃদ্ধ ইহুদি ইতিহাস। মধ্যপ্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অনেক দেশের তুলনায় ইরানে ইহুদি-বিদ্বেষের ইতিহাস নেই বললেই চলে এবং সেখানকার ইহুদিরা ইরানকে নিজেদের আদি বাড়ি মনে করে পারস্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর নাড়ির টান অনুভব করেন।
ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে ব্যবিলনীয় নির্বাসনের সময় জুডিয়ার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ইহুদিরা পারস্য মালভূমিতে ছড়িয়ে পড়েন, যেখানে পরবর্তীতে ইসলামের আগমন এবং 'আহলুল কিতাব' হিসেবে স্বীকৃতি তাদের জন্য বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এরপর ১৯০৬ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ইহুদিরা দেশটির সংসদে একটি স্থায়ী আসন লাভ করে এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইরাকের দাঙ্গার সময়ও বিপুল সংখ্যক ইহুদি এখানে আশ্রয় পান।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও ইরানের বিশাল ইহুদি জনগোষ্ঠীর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ সেখানে পাড়ি জমায়, তবে শাহের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বহু তরুণ ও প্রগতিশীল ইরানি ইহুদি তৎকালীন গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’-এর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনী এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় স্পষ্ট করে দেন যে, রাজনৈতিক আন্দোলন ‘জায়নিজম’-এর সঙ্গে সাধারণ ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ইরানের ইহুদিরা এই জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই সম্প্রদায়ের মিশ্র অভিজ্ঞতা হলেও, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইহুদিদের জন্য উত্তরাধিকার আইন সহজ করা, বিশ্রামের দিন ‘শাবাত’-এ ইহুদি শিশুদের স্কুলে যাওয়া থেকে ছাড় দেওয়া এবং যুদ্ধে প্রাণ হারানো ইহুদি সৈন্যদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ উন্মোচনের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন।
বর্তমানে ইরানে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ইহুদি বসবাস করছেন, যা ইসরাইল ও তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের মতো বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ৬০টি সিনাগগ, ইহুদি স্কুল ও কোশার কসাইখানা রয়েছে এবং তারা আধ্যাত্মিক পবিত্র স্থান হিসেবে ইসরাইল ও রাজনৈতিক মাতৃভূমি হিসেবে ইরানের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রেখে চলেন।
সম্প্রতি তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলায় একটি সিনাগগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরানের ইহুদি সম্প্রদায় ও তাদের সংসদীয় প্রতিনিধিরা এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দেন। সেই সাথে ধ্বংসস্তূপ থেকে পবিত্র তোরাহ স্ক্রল অক্ষত উদ্ধার করতে ভারি যন্ত্রপাতির বদলে হাত দিয়ে সাবধানে কাজ করার জন্য ইহুদি সম্প্রদায়ের অনুরোধ ফরাসি গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী ইরানি প্রশাসন রক্ষা করেছিল, যা তাদের প্রতি প্রশাসনের প্রকৃত শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের চিত্র তুলে ধরে।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
পাশ্চাত্যে ইরানকে সাধারণত ইহুদি-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হলেও, দেশটির বুক চিরে রয়েছে প্রায় ২,৭০০ বছরের পুরোনো এক সমৃদ্ধ ইহুদি ইতিহাস। মধ্যপ্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অনেক দেশের তুলনায় ইরানে ইহুদি-বিদ্বেষের ইতিহাস নেই বললেই চলে এবং সেখানকার ইহুদিরা ইরানকে নিজেদের আদি বাড়ি মনে করে পারস্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর নাড়ির টান অনুভব করেন।
ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে ব্যবিলনীয় নির্বাসনের সময় জুডিয়ার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ইহুদিরা পারস্য মালভূমিতে ছড়িয়ে পড়েন, যেখানে পরবর্তীতে ইসলামের আগমন এবং 'আহলুল কিতাব' হিসেবে স্বীকৃতি তাদের জন্য বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এরপর ১৯০৬ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ইহুদিরা দেশটির সংসদে একটি স্থায়ী আসন লাভ করে এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইরাকের দাঙ্গার সময়ও বিপুল সংখ্যক ইহুদি এখানে আশ্রয় পান।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও ইরানের বিশাল ইহুদি জনগোষ্ঠীর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ সেখানে পাড়ি জমায়, তবে শাহের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বহু তরুণ ও প্রগতিশীল ইরানি ইহুদি তৎকালীন গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’-এর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনী এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় স্পষ্ট করে দেন যে, রাজনৈতিক আন্দোলন ‘জায়নিজম’-এর সঙ্গে সাধারণ ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ইরানের ইহুদিরা এই জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই সম্প্রদায়ের মিশ্র অভিজ্ঞতা হলেও, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইহুদিদের জন্য উত্তরাধিকার আইন সহজ করা, বিশ্রামের দিন ‘শাবাত’-এ ইহুদি শিশুদের স্কুলে যাওয়া থেকে ছাড় দেওয়া এবং যুদ্ধে প্রাণ হারানো ইহুদি সৈন্যদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ উন্মোচনের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন।
বর্তমানে ইরানে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ইহুদি বসবাস করছেন, যা ইসরাইল ও তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের মতো বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ৬০টি সিনাগগ, ইহুদি স্কুল ও কোশার কসাইখানা রয়েছে এবং তারা আধ্যাত্মিক পবিত্র স্থান হিসেবে ইসরাইল ও রাজনৈতিক মাতৃভূমি হিসেবে ইরানের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রেখে চলেন।
সম্প্রতি তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলায় একটি সিনাগগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরানের ইহুদি সম্প্রদায় ও তাদের সংসদীয় প্রতিনিধিরা এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দেন। সেই সাথে ধ্বংসস্তূপ থেকে পবিত্র তোরাহ স্ক্রল অক্ষত উদ্ধার করতে ভারি যন্ত্রপাতির বদলে হাত দিয়ে সাবধানে কাজ করার জন্য ইহুদি সম্প্রদায়ের অনুরোধ ফরাসি গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী ইরানি প্রশাসন রক্ষা করেছিল, যা তাদের প্রতি প্রশাসনের প্রকৃত শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের চিত্র তুলে ধরে।

আপনার মতামত লিখুন