কয়েক মাস ধরে সেনা সংকট এবং মার্কিন সহায়তার অনিশ্চয়তায় ধুঁকতে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেদের এক অবিশ্বাস্য বিবর্তন ঘটিয়েছে। আভিদিভকা ও বাখমুতের মতো নৃশংস নগর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা কমান্ডাররা এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাইলের পর মাইল দূরে গেমিং চেয়ারে বসে রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকের মাধ্যমে 'মানবহীন' যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার তিনটি ফ্রন্টলাইন লক্ষ্যবস্তুতে ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটানোর পুরো অভিযানে মাটিতে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার প্রয়োজনই পড়েনি। ড্রোনের লাইভ স্ট্রিম দেখে পরিচালিত এই মানবহীন যুদ্ধযন্ত্রগুলো জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি মিশন সম্পন্ন করেছে এবং গত এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে রাশিয়ার একটি ঘাঁটিও দখল করেছে ইউক্রেন।
এসব নতুন যুদ্ধকৌশল মূলত ইউক্রেনের তীব্র জনবল সংকট থেকে তৈরি হয়েছে। থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের ‘NC13’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, বিগত ১৬৪টি হামলায় রোবটের জায়গায় সমপরিমাণ কার্যকারিতা পেতে ২ হাজার ৩০০ জন সেনার প্রয়োজন হতো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্ধেক সেনার হতাহতের ঝুঁকি থাকত। এই ধীরগতির চলনক্ষম বোমাগুলো এক প্রযুক্তিগত আশীর্বাদ হিসেবে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে। রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানা গেছে, শত্রুরা এই চার চাকার চ্যাসিসের ওপর বিশাল বিস্ফোরক বহনকারী রোবটগুলোকে ‘নীরব মৃত্যু’ (সাইলেন্ট ডেথ) নামে ডাকে, যা মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে পৌঁছালে টের পাওয়া যায়।
ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা চলতি বছরে অর্জনও করেছে। গত ২৭ মে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে যে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এই নতুন যুদ্ধের পেছনে ২২ বছর বয়সি ‘গোরা’র মতো এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা যুক্ত আছেন, যারা অপারেটর ও যানের মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখতে কাজ করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে লোকেশন ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে অনেক সময় দিনের বেলায় ড্রোনে রেকর্ড করা ভিডিও দেখে এবং বোমায় ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফসলি জমির নিখুঁত রুট ম্যাপ তৈরি করে রোবটগুলোকে পথ দেখাতে হয়।
মাটির ওপরে পদাতিক বাহিনীর সাধারণ কাজগুলোও এখন রোবট করে দিচ্ছে। ‘সাইবার’ নামের এক যোদ্ধা ও তার দল একটি ট্যাংকের ট্র্যাকে ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান ও একগুচ্ছ ক্যামেরা মাউন্ট করার কাজ করছেন, যা কোনো পানি, খাবার বা বিশ্রাম ছাড়াই দিনের পর দিন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে লক্ষ্যবস্তুর শিকার করতে পারে। এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এটিকে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়। বর্তমানে এই যানগুলো ফ্রন্টলাইনের নিয়মিত সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে আহতদের উদ্ধার করা ও রসদ সরবরাহের কাজও করছে। তবে রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট ইউনিটের কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রন্টলাইনের সম্মুখ সমরে থাকা ইউক্রেনীয় সেনারা প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন এবং কিয়েভ সামরিক বয়সি পুরুষদের খুঁজে পেতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা ‘ক্রো’ এবং ‘ক্রিপি’ যথাক্রমে ৩৪৪ দিন এবং ৩৩৪ দিন ধরে কোনো বিরতিহীনভাবে ফ্রন্টলাইনের বাঙ্কারে কাটিয়েছেন। ড্রোন হামলা এতটাই অবিরাম ছিল যে, বাঙ্কার তৈরি করার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। প্রায় এক বছর পর এই দুই যোদ্ধা যখন বাঙ্কার থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসেন, তখনও ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে এফপিভি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এই যন্ত্রের সর্বব্যাপী উপস্থিতি এখন যুদ্ধের পুরো সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।

রোববার, ৩১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
কয়েক মাস ধরে সেনা সংকট এবং মার্কিন সহায়তার অনিশ্চয়তায় ধুঁকতে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেদের এক অবিশ্বাস্য বিবর্তন ঘটিয়েছে। আভিদিভকা ও বাখমুতের মতো নৃশংস নগর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা কমান্ডাররা এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাইলের পর মাইল দূরে গেমিং চেয়ারে বসে রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকের মাধ্যমে 'মানবহীন' যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার তিনটি ফ্রন্টলাইন লক্ষ্যবস্তুতে ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটানোর পুরো অভিযানে মাটিতে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার প্রয়োজনই পড়েনি। ড্রোনের লাইভ স্ট্রিম দেখে পরিচালিত এই মানবহীন যুদ্ধযন্ত্রগুলো জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি মিশন সম্পন্ন করেছে এবং গত এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে রাশিয়ার একটি ঘাঁটিও দখল করেছে ইউক্রেন।
এসব নতুন যুদ্ধকৌশল মূলত ইউক্রেনের তীব্র জনবল সংকট থেকে তৈরি হয়েছে। থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের ‘NC13’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, বিগত ১৬৪টি হামলায় রোবটের জায়গায় সমপরিমাণ কার্যকারিতা পেতে ২ হাজার ৩০০ জন সেনার প্রয়োজন হতো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্ধেক সেনার হতাহতের ঝুঁকি থাকত। এই ধীরগতির চলনক্ষম বোমাগুলো এক প্রযুক্তিগত আশীর্বাদ হিসেবে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে। রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানা গেছে, শত্রুরা এই চার চাকার চ্যাসিসের ওপর বিশাল বিস্ফোরক বহনকারী রোবটগুলোকে ‘নীরব মৃত্যু’ (সাইলেন্ট ডেথ) নামে ডাকে, যা মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে পৌঁছালে টের পাওয়া যায়।
ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা চলতি বছরে অর্জনও করেছে। গত ২৭ মে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে যে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এই নতুন যুদ্ধের পেছনে ২২ বছর বয়সি ‘গোরা’র মতো এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা যুক্ত আছেন, যারা অপারেটর ও যানের মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখতে কাজ করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে লোকেশন ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে অনেক সময় দিনের বেলায় ড্রোনে রেকর্ড করা ভিডিও দেখে এবং বোমায় ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফসলি জমির নিখুঁত রুট ম্যাপ তৈরি করে রোবটগুলোকে পথ দেখাতে হয়।
মাটির ওপরে পদাতিক বাহিনীর সাধারণ কাজগুলোও এখন রোবট করে দিচ্ছে। ‘সাইবার’ নামের এক যোদ্ধা ও তার দল একটি ট্যাংকের ট্র্যাকে ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান ও একগুচ্ছ ক্যামেরা মাউন্ট করার কাজ করছেন, যা কোনো পানি, খাবার বা বিশ্রাম ছাড়াই দিনের পর দিন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে লক্ষ্যবস্তুর শিকার করতে পারে। এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এটিকে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়। বর্তমানে এই যানগুলো ফ্রন্টলাইনের নিয়মিত সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে আহতদের উদ্ধার করা ও রসদ সরবরাহের কাজও করছে। তবে রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট ইউনিটের কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রন্টলাইনের সম্মুখ সমরে থাকা ইউক্রেনীয় সেনারা প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন এবং কিয়েভ সামরিক বয়সি পুরুষদের খুঁজে পেতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা ‘ক্রো’ এবং ‘ক্রিপি’ যথাক্রমে ৩৪৪ দিন এবং ৩৩৪ দিন ধরে কোনো বিরতিহীনভাবে ফ্রন্টলাইনের বাঙ্কারে কাটিয়েছেন। ড্রোন হামলা এতটাই অবিরাম ছিল যে, বাঙ্কার তৈরি করার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। প্রায় এক বছর পর এই দুই যোদ্ধা যখন বাঙ্কার থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসেন, তখনও ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে এফপিভি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এই যন্ত্রের সর্বব্যাপী উপস্থিতি এখন যুদ্ধের পুরো সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন