ঢাকা নিউজ

জনহিতৈষী ভাবমূর্তির আড়ালে বিল গেটসের অন্য রূপের উন্মোচন



জনহিতৈষী ভাবমূর্তির আড়ালে বিল গেটসের অন্য রূপের উন্মোচন
ছবি : সংগৃহীত

বছরের পর বছর ধরে সযত্নে গড়ে তোলা মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের জনহিতৈষী ও সরল ভাবমূর্তি এখন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক নিয়ে ক্রমবর্ধমান তদন্তের মাঝেই সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি বিস্তারিত ও বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উঠে এসেছে কীভাবে কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে গেটসের সহজলভ্য ও শান্ত ভাবমূর্তি তৈরি করতে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত পরিকল্পিত কৌশল নেওয়া হতো।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে কথা বলা কর্মীরা জানিয়েছেন, বিল গেটসের বাহ্যিক চেহারা ও পোশাক-আশাক অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ব্যবস্থাপনা করা হতো। এমনকি তার পোশাক পরীক্ষার জন্য বিশেষ মাপের একটি ম্যানিকুইন বা পুতুলও ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে ১০২.৮ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক এই ধনকুবেরকে যেন দূরের কোনো মানুষ মনে না হয়, সেজন্য তার পরিচিত চশমা, সাদামাটা ভি-নেক সোয়েটার ও বোতাম লাগানো শার্টের একটি বিশেষ পোশাক সংগ্রহ তৈরি রাখা হতো এবং গণমাধ্যমে প্রতিটি উপস্থিতির আগে কর্মীরাই তা বাছাই করে দিতেন।

তার বাস্তব জীবনের পাশাপাশি অনলাইন উপস্থিতিও ছিল ভীষণ রকম পরিকল্পিত। নিজস্ব ব্লগ ‘গেটস নোটস’-এ পাঠক টানতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসরণকারী বাড়াতে নানা কৌশল নেওয়া হতো, যার একটি বড় উদাহরণ ছিল বন্ধু ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে ডেইরি কুইনে আইসক্রিম পরিবেশন করার একটি ভাইরাল ইউটিউব ভিডিও।

এমনকি ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া তার দ্বিতীয় নেটফ্লিক্স তথ্যচিত্র ‘হোয়াটস নেক্সট? দ্য ফিউচার উইথ বিল গেটস’ প্রকাশের আগেও গেটসের ভাবমূর্তি রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। তথ্যচিত্রটির বিভিন্ন পর্ব দেখার পর গেটসের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গেটস ভেঞ্চারসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রযোজনা দলকে নয় পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ মন্তব্যপত্র পাঠিয়েছিলেন, যেখানে গেটসের মুখের ‘বিরক্ত ভাব’ বদলানো এবং বার্নি স্যান্ডার্সের পরিচিতি গেটসের ‘ওপরে’ দেখানোর অদ্ভুত বিষয়টি সংশোধনের কথা বলা হয়; যদিও নেটফ্লিক্সের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অনুমোদন কেবল তাদের কাছেই ছিল।

গেটস ফাউন্ডেশন ও গেটস ভেঞ্চারস নিয়মিতভাবে বিল গেটসের জনপ্রিয়তা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও অনুপ্রেরণার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে আসছিল। তারা দেখতে পায় যে, জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সংযোগ এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত এপস্টাইন ফাইলের বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগগুলোই বিশ্বজুড়ে গেটসের নামে নেতিবাচক সংবাদ ছড়ানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বিতর্কের রেশ ধরে ২০২১ সালের বিবাহবিচ্ছেদের পর তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস জানিয়েছিলেন যে, এপস্টাইন ফাইলে তার সাবেক স্বামী সম্পর্কিত অভিযোগগুলো জেনে তিনি অবিশ্বাস্য রকম দুঃখ পেয়েছেন। পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে কর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় বিল গেটস নিজেই স্বীকার করেন যে, দুজন রুশ নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং এপস্টাইনের সঙ্গে তার এই পরিচয় ফাউন্ডেশনের মূল নীতি ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।

এপস্টাইন ফাইলে নতুন করে নাম আসার কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইম্প্যাক্ট সামিট’-এ তার নির্ধারিত মূল বক্তৃতাটি শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বাতিল করা হয় এবং তিনি সেখান থেকে সরে দাঁড়ান।

ইউগভের (YouGov) করা সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বিল গেটসের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তার জনসংযোগ দল তাকে এখন জনসাধারণের সামনে কম আসার পরামর্শ দিচ্ছে, যার ফলে তিনি ওয়াশিংটনে প্রতিবছর তার নিজের বাড়িতে আয়োজিত সিইও সম্মেলনের নৈশভোজ বাতিল করেছেন এবং বাফেটের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকেও অংশ নেননি; এমনকি বাফেট নিজেও জানিয়েছেন যে এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পর থেকে তিনি গেটসের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

আগামী ১০ জুন মার্কিন হাউস ওভারসাইট কমিটির সামনে বন্ধ দরজায় বিল গেটসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এপস্টাইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হবে।

এই পুরো বিষয়ে বিল গেটসের একজন মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন যে, গেটস অতীতে করা এই ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আগামী মাসে স্বেচ্ছায় হাউস ওভারসাইট কমিটির মুখোমুখি হবেন; পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা যাতে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার পান, সেই আশায় গেটস সব এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬


জনহিতৈষী ভাবমূর্তির আড়ালে বিল গেটসের অন্য রূপের উন্মোচন

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

বছরের পর বছর ধরে সযত্নে গড়ে তোলা মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের জনহিতৈষী ও সরল ভাবমূর্তি এখন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক নিয়ে ক্রমবর্ধমান তদন্তের মাঝেই সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি বিস্তারিত ও বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উঠে এসেছে কীভাবে কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে গেটসের সহজলভ্য ও শান্ত ভাবমূর্তি তৈরি করতে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত পরিকল্পিত কৌশল নেওয়া হতো।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে কথা বলা কর্মীরা জানিয়েছেন, বিল গেটসের বাহ্যিক চেহারা ও পোশাক-আশাক অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ব্যবস্থাপনা করা হতো। এমনকি তার পোশাক পরীক্ষার জন্য বিশেষ মাপের একটি ম্যানিকুইন বা পুতুলও ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে ১০২.৮ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক এই ধনকুবেরকে যেন দূরের কোনো মানুষ মনে না হয়, সেজন্য তার পরিচিত চশমা, সাদামাটা ভি-নেক সোয়েটার ও বোতাম লাগানো শার্টের একটি বিশেষ পোশাক সংগ্রহ তৈরি রাখা হতো এবং গণমাধ্যমে প্রতিটি উপস্থিতির আগে কর্মীরাই তা বাছাই করে দিতেন।

তার বাস্তব জীবনের পাশাপাশি অনলাইন উপস্থিতিও ছিল ভীষণ রকম পরিকল্পিত। নিজস্ব ব্লগ ‘গেটস নোটস’-এ পাঠক টানতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসরণকারী বাড়াতে নানা কৌশল নেওয়া হতো, যার একটি বড় উদাহরণ ছিল বন্ধু ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে ডেইরি কুইনে আইসক্রিম পরিবেশন করার একটি ভাইরাল ইউটিউব ভিডিও।

এমনকি ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া তার দ্বিতীয় নেটফ্লিক্স তথ্যচিত্র ‘হোয়াটস নেক্সট? দ্য ফিউচার উইথ বিল গেটস’ প্রকাশের আগেও গেটসের ভাবমূর্তি রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। তথ্যচিত্রটির বিভিন্ন পর্ব দেখার পর গেটসের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গেটস ভেঞ্চারসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রযোজনা দলকে নয় পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ মন্তব্যপত্র পাঠিয়েছিলেন, যেখানে গেটসের মুখের ‘বিরক্ত ভাব’ বদলানো এবং বার্নি স্যান্ডার্সের পরিচিতি গেটসের ‘ওপরে’ দেখানোর অদ্ভুত বিষয়টি সংশোধনের কথা বলা হয়; যদিও নেটফ্লিক্সের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অনুমোদন কেবল তাদের কাছেই ছিল।

গেটস ফাউন্ডেশন ও গেটস ভেঞ্চারস নিয়মিতভাবে বিল গেটসের জনপ্রিয়তা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও অনুপ্রেরণার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে আসছিল। তারা দেখতে পায় যে, জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সংযোগ এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত এপস্টাইন ফাইলের বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগগুলোই বিশ্বজুড়ে গেটসের নামে নেতিবাচক সংবাদ ছড়ানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বিতর্কের রেশ ধরে ২০২১ সালের বিবাহবিচ্ছেদের পর তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস জানিয়েছিলেন যে, এপস্টাইন ফাইলে তার সাবেক স্বামী সম্পর্কিত অভিযোগগুলো জেনে তিনি অবিশ্বাস্য রকম দুঃখ পেয়েছেন। পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে কর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় বিল গেটস নিজেই স্বীকার করেন যে, দুজন রুশ নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং এপস্টাইনের সঙ্গে তার এই পরিচয় ফাউন্ডেশনের মূল নীতি ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।

এপস্টাইন ফাইলে নতুন করে নাম আসার কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইম্প্যাক্ট সামিট’-এ তার নির্ধারিত মূল বক্তৃতাটি শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বাতিল করা হয় এবং তিনি সেখান থেকে সরে দাঁড়ান।

ইউগভের (YouGov) করা সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বিল গেটসের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তার জনসংযোগ দল তাকে এখন জনসাধারণের সামনে কম আসার পরামর্শ দিচ্ছে, যার ফলে তিনি ওয়াশিংটনে প্রতিবছর তার নিজের বাড়িতে আয়োজিত সিইও সম্মেলনের নৈশভোজ বাতিল করেছেন এবং বাফেটের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকেও অংশ নেননি; এমনকি বাফেট নিজেও জানিয়েছেন যে এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পর থেকে তিনি গেটসের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

আগামী ১০ জুন মার্কিন হাউস ওভারসাইট কমিটির সামনে বন্ধ দরজায় বিল গেটসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এপস্টাইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হবে।

এই পুরো বিষয়ে বিল গেটসের একজন মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন যে, গেটস অতীতে করা এই ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আগামী মাসে স্বেচ্ছায় হাউস ওভারসাইট কমিটির মুখোমুখি হবেন; পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা যাতে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার পান, সেই আশায় গেটস সব এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ