ত্রিমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধরনের একটি ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশন রোগীদের শরীরের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে। চিকিৎসকেরা এই ফলাফলকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে অভিহিত করেছেন, যা ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ১১টি দেশে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক ট্রায়ালে এমন রোগীদের এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে বা পুনরায় ফিরে এসেছে এবং প্রচলিত চিকিৎসায় কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
‘অ্যামিভ্যান্টাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি রোগীর টিউমার ছোট করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। ট্রায়ালে বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার—মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়, যার মধ্যে ১৫ জন রোগীর টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। গবেষকেরা জানান, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের উদ্ভাবিত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে ফুসফুসের পাশাপাশি মলাশয়, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয় চিকিৎসারই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি নজিরবিহীন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হ্যারিংটন আরও জানান, এই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিকাগোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় আজ রবিবার এই ফলাফল উপস্থাপন করা হবে।
এই ‘স্মার্ট’ ইনজেকশনটি তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে। প্রথমত, এটি ইজিএফআর প্রোটিনকে বাধা দেয় যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে; দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি পথ বন্ধ করে দেয় যা ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ প্রচলিত চিকিৎসাকে ফাঁকি দেয়; এবং তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। অন্যান্য ক্যানসার চিকিৎসার মতো এটি শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, যা দ্রুত ও সহজ। প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার।
এই চিকিৎসার সুফল পাওয়া প্রথমদিকের একজন রোগী হলেন ৫৬ বছর বয়সি কার্ল ওয়ালশ, যার ২০২৪ সালের মে মাসে জিহ্বায় ক্যানসার ধরা পড়েছিল এবং প্রচলিত চিকিৎসায় সুফল না পেয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই ট্রায়ালে যোগ দেন। তিনি জানান, ট্রায়াল শুরুর আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে বা খেতে পারতেন না, তবে চিকিৎসা শুরুর পর ফোলা ও ব্যথা কমে এখন তিনি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখছেন।
গবেষকেরা জানান, এই ট্রায়ালে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) পজিটিভ ওরোফ্যারিন্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার রোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, যা চিকিৎসা করা সাধারণত আরও কঠিন। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা যেখানে খুবই কম থাকে, সেখানে অ্যামিভ্যান্টাম্যাব নেওয়া রোগীরা চিকিৎসা শুরুর পর গড়ে সাড়ে ১২ মাস বেঁচে ছিলেন। আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন এমন ক্যানসার রোগীদের মধ্যে এই মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক হার অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

রোববার, ৩১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
ত্রিমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধরনের একটি ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশন রোগীদের শরীরের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে। চিকিৎসকেরা এই ফলাফলকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে অভিহিত করেছেন, যা ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ১১টি দেশে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক ট্রায়ালে এমন রোগীদের এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে বা পুনরায় ফিরে এসেছে এবং প্রচলিত চিকিৎসায় কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
‘অ্যামিভ্যান্টাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি রোগীর টিউমার ছোট করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। ট্রায়ালে বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার—মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়, যার মধ্যে ১৫ জন রোগীর টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। গবেষকেরা জানান, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের উদ্ভাবিত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে ফুসফুসের পাশাপাশি মলাশয়, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয় চিকিৎসারই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি নজিরবিহীন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হ্যারিংটন আরও জানান, এই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিকাগোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় আজ রবিবার এই ফলাফল উপস্থাপন করা হবে।
এই ‘স্মার্ট’ ইনজেকশনটি তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে। প্রথমত, এটি ইজিএফআর প্রোটিনকে বাধা দেয় যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে; দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি পথ বন্ধ করে দেয় যা ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ প্রচলিত চিকিৎসাকে ফাঁকি দেয়; এবং তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। অন্যান্য ক্যানসার চিকিৎসার মতো এটি শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, যা দ্রুত ও সহজ। প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার।
এই চিকিৎসার সুফল পাওয়া প্রথমদিকের একজন রোগী হলেন ৫৬ বছর বয়সি কার্ল ওয়ালশ, যার ২০২৪ সালের মে মাসে জিহ্বায় ক্যানসার ধরা পড়েছিল এবং প্রচলিত চিকিৎসায় সুফল না পেয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই ট্রায়ালে যোগ দেন। তিনি জানান, ট্রায়াল শুরুর আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে বা খেতে পারতেন না, তবে চিকিৎসা শুরুর পর ফোলা ও ব্যথা কমে এখন তিনি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখছেন।
গবেষকেরা জানান, এই ট্রায়ালে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) পজিটিভ ওরোফ্যারিন্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার রোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, যা চিকিৎসা করা সাধারণত আরও কঠিন। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা যেখানে খুবই কম থাকে, সেখানে অ্যামিভ্যান্টাম্যাব নেওয়া রোগীরা চিকিৎসা শুরুর পর গড়ে সাড়ে ১২ মাস বেঁচে ছিলেন। আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন এমন ক্যানসার রোগীদের মধ্যে এই মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক হার অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আপনার মতামত লিখুন