ঢাকা নিউজ

মরুর বুকে চালকবিহীন মনোরেল: আফ্রিকায় মিশরের নতুন ইতিহাস



মরুর বুকে চালকবিহীন মনোরেল: আফ্রিকায় মিশরের নতুন ইতিহাস
ছবি : সংগৃহীত

যানজটের জন্য কুখ্যাত মিশরের রাজধানী কায়রোর পরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করে চালু হয়েছে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্ক। মরুভূমির মাঝখানে গড়ে ওঠা নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর সঙ্গে কায়রোকে যুক্ত করতে গত মে মাসে এই মনোরেল প্রথমবারের মতো যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রকল্পটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্কে পরিণত হবে।

বর্তমানে চালু হওয়া ‘ইস্ট নাইল’ রুটটি ৫৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা কায়রোর নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এলাকা থেকে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া গিজা থেকে সিক্সথ অব অক্টোবর সিটি পর্যন্ত সংযোগকারী ৪৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ওয়েস্ট নাইল’ রুটের নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে। দুই রুট মিলিয়ে মোট ১০০ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্কটি বিশ্বের দীর্ঘতম মনোরেল হিসেবে পরিচিত চীনের চংকিং মনোরেল নেটওয়ার্ককেও ছাড়িয়ে যাবে।

ভাড়া ও যাত্রী ধারণক্ষমতা

  • ভাড়া: চারটি ভাড়ার অঞ্চলের ভিত্তিতে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো ইস্ট নাইল রুটে একমুখী যাত্রার ভাড়া ৮০ মিসরীয় পাউন্ড। এছাড়া ত্রৈমাসিক পাসের মূল্য অঞ্চলভেদে ১,৮০০ থেকে ৭,২০০ মিসরীয় পাউন্ড পর্যন্ত।

  • যাত্রী ধারণক্ষমতা: প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ যাত্রী এই মনোরেল ব্যবহার করতে পারবেন। ৬৮টি ট্রেনের সমন্বয়ে গঠিত এই নেটওয়ার্ক ঘণ্টায় প্রতি দিকে প্রায় ৪৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলী

২০১৯ সালে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি রেল পরিবহন প্রতিষ্ঠান আলস্টমকে এই নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আলস্টম কায়রোভিত্তিক ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এবং আরব কন্ট্রাক্টরসের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

প্রযুক্তির বিশেষত্ব: মনোরেলটিতে আলস্টমের ‘ইনোভিয়া’ প্রযুক্তি ও উন্নত রেডিও যোগাযোগভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ট্রেন চালানো, থামানো, দরজা নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজ মানবচালক ছাড়াই সম্পন্ন করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত কম শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এবং ব্রেকিংয়ের সময় উৎপন্ন শক্তির ৯৯% পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম, যা জ্বালানি খরচ কমায়।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে উদ্বোধনের কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা বিলম্বের মুখে পড়ে এবং ইস্ট নাইল রুটের ২২টি স্টেশনের মধ্যে এখনো ৬টি চালু হওয়া বাকি রয়েছে। এছাড়া মিশরের এই ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ১.৭ ট্রিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করায় দেশটির বৈদেশিক ঋণ ১৬৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

সমালোচকদের মতে, নতুন প্রশাসনিক রাজধানী এখনো পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় এটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের যাতায়াতের কষ্ট কমাতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে সরকার আশা করছে, ভবিষ্যতে নতুন রাজধানীতে ৬৫ লাখ মানুষ বসবাস করবে এবং প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আলস্টমের মিশর শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামি সালাহ এলদিন বলেন, "এই মনোরেল মিশরের ভিশন ২০৩০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহনের প্রতীক।" এই প্রকল্পে কর্মরত জনবলের ৯৮% মানুষই মিসরীয়।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা নিউজ

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬


মরুর বুকে চালকবিহীন মনোরেল: আফ্রিকায় মিশরের নতুন ইতিহাস

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

featured Image

যানজটের জন্য কুখ্যাত মিশরের রাজধানী কায়রোর পরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করে চালু হয়েছে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্ক। মরুভূমির মাঝখানে গড়ে ওঠা নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর সঙ্গে কায়রোকে যুক্ত করতে গত মে মাসে এই মনোরেল প্রথমবারের মতো যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রকল্পটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্কে পরিণত হবে।

বর্তমানে চালু হওয়া ‘ইস্ট নাইল’ রুটটি ৫৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা কায়রোর নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এলাকা থেকে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া গিজা থেকে সিক্সথ অব অক্টোবর সিটি পর্যন্ত সংযোগকারী ৪৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ওয়েস্ট নাইল’ রুটের নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে। দুই রুট মিলিয়ে মোট ১০০ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্কটি বিশ্বের দীর্ঘতম মনোরেল হিসেবে পরিচিত চীনের চংকিং মনোরেল নেটওয়ার্ককেও ছাড়িয়ে যাবে।

ভাড়া ও যাত্রী ধারণক্ষমতা

  • ভাড়া: চারটি ভাড়ার অঞ্চলের ভিত্তিতে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো ইস্ট নাইল রুটে একমুখী যাত্রার ভাড়া ৮০ মিসরীয় পাউন্ড। এছাড়া ত্রৈমাসিক পাসের মূল্য অঞ্চলভেদে ১,৮০০ থেকে ৭,২০০ মিসরীয় পাউন্ড পর্যন্ত।

  • যাত্রী ধারণক্ষমতা: প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ যাত্রী এই মনোরেল ব্যবহার করতে পারবেন। ৬৮টি ট্রেনের সমন্বয়ে গঠিত এই নেটওয়ার্ক ঘণ্টায় প্রতি দিকে প্রায় ৪৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলী

২০১৯ সালে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি রেল পরিবহন প্রতিষ্ঠান আলস্টমকে এই নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আলস্টম কায়রোভিত্তিক ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এবং আরব কন্ট্রাক্টরসের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

প্রযুক্তির বিশেষত্ব: মনোরেলটিতে আলস্টমের ‘ইনোভিয়া’ প্রযুক্তি ও উন্নত রেডিও যোগাযোগভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ট্রেন চালানো, থামানো, দরজা নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজ মানবচালক ছাড়াই সম্পন্ন করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত কম শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এবং ব্রেকিংয়ের সময় উৎপন্ন শক্তির ৯৯% পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম, যা জ্বালানি খরচ কমায়।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে উদ্বোধনের কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা বিলম্বের মুখে পড়ে এবং ইস্ট নাইল রুটের ২২টি স্টেশনের মধ্যে এখনো ৬টি চালু হওয়া বাকি রয়েছে। এছাড়া মিশরের এই ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ১.৭ ট্রিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করায় দেশটির বৈদেশিক ঋণ ১৬৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

সমালোচকদের মতে, নতুন প্রশাসনিক রাজধানী এখনো পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় এটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের যাতায়াতের কষ্ট কমাতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে সরকার আশা করছে, ভবিষ্যতে নতুন রাজধানীতে ৬৫ লাখ মানুষ বসবাস করবে এবং প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আলস্টমের মিশর শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামি সালাহ এলদিন বলেন, "এই মনোরেল মিশরের ভিশন ২০৩০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহনের প্রতীক।" এই প্রকল্পে কর্মরত জনবলের ৯৮% মানুষই মিসরীয়।


ঢাকা নিউজ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: ফারুক মৃধা
সহ-সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার শাহ

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত ঢাকা নিউজ