প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত ঘনীভূত হতে থাকা একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন ওলটপালট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি ইতিহাসে রেকর্ডকৃত অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ইভেন্টে রূপ নিতে পারে, যা আগামী শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, “এল নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।”
‘এল নিনো’ আসলে কী? এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নিয়ত বায়ু (ট্রেড উইন্ড) দুর্বল হয়ে পড়লে মহাসাগরের উপরিভাগে উষ্ণ পানি জমতে শুরু করে, যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নাসা-র গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের পরিচালক গ্যাভিন স্মিডট জানান, এটি আসলে একটি বৈশ্বিক চেইন রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা হাজার হাজার মাইল দূরের আবহাওয়া চক্রকে ভেঙে ফেলে।
নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল রাউন্ডির মতে, গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
জলবায়ু ও জনজীবনে সম্ভাব্য প্রভাবসমূহ:
তীব্র খরা ও পানির সংকট: মধ্য আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে এল নিনোর কারণে তীব্র গরম ও শুষ্কতা দেখা দেবে। ইতোমধ্যে হন্ডুরাসের প্রায় ৭৫টি পৌরসভা মারাত্মক খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং রাজধানী তেগুসিগালপায় পানি ব্যবহারের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
বিধ্বংসী বন্যা: বিপরীত চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি ও বন্যা হতে পারে। এর আগে ২০১৫-২০১৬ সালের এল নিনোর সময় ফসলহানির কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছিল।
দাবানলের ঝুঁকি: তীব্র তাপ ও খরা পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাজন রেইনফরেস্টে ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাস্তুতন্ত্র ও কৃষি: সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রবাল প্রাচীরগুলো হুমকির মুখে পড়ছে এবং ‘কোরাল ব্লিচিং’ (প্রবাল বিবর্ণ হয়ে মারা যাওয়া) ঘটছে। অন্যদিকে, ভারতের আম চাষিরা জানিয়েছেন যে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে আমের মুকুল ও ফলন ব্যাহত হয়েছে।
ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের ওপর প্রভাব: আবহাওয়া বিজ্ঞানী ব্রায়ান ট্যাং জানান, এল নিনোর কারণে আটলান্টিক মহাসাগরে মেঘ, বজ্রঝড় ও ঘূর্ণিঝড় কমে যায়। তবে ঝড় কম হলেও কোনো ঝড় একবার শক্তিশালী রূপ নিলে তা মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। অপরদিকে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব সম্পূর্ণ উল্টো—সেখানে এটি আরও ঘন ঘন এবং শক্তিশালী ঝড় তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
জার্মানির ন্যাশনাল ওসিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাইকেল ম্যাকফ্যাডেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনোকে শক্তিশালী না করলেও এর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি স্বাভাবিক খরাকে এটি চরম খরায় রূপান্তর করতে পারে।
আগে থেকেই প্রস্তুতির সুযোগ: বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এল নিনোর একটি ইতিবাচক দিক হলো এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে তৈরি হয় এবং কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে, ফসল রক্ষা করতে বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পায়।

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত ঘনীভূত হতে থাকা একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন ওলটপালট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি ইতিহাসে রেকর্ডকৃত অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ইভেন্টে রূপ নিতে পারে, যা আগামী শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, “এল নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।”
‘এল নিনো’ আসলে কী? এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নিয়ত বায়ু (ট্রেড উইন্ড) দুর্বল হয়ে পড়লে মহাসাগরের উপরিভাগে উষ্ণ পানি জমতে শুরু করে, যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নাসা-র গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের পরিচালক গ্যাভিন স্মিডট জানান, এটি আসলে একটি বৈশ্বিক চেইন রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা হাজার হাজার মাইল দূরের আবহাওয়া চক্রকে ভেঙে ফেলে।
নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল রাউন্ডির মতে, গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
জলবায়ু ও জনজীবনে সম্ভাব্য প্রভাবসমূহ:
তীব্র খরা ও পানির সংকট: মধ্য আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে এল নিনোর কারণে তীব্র গরম ও শুষ্কতা দেখা দেবে। ইতোমধ্যে হন্ডুরাসের প্রায় ৭৫টি পৌরসভা মারাত্মক খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং রাজধানী তেগুসিগালপায় পানি ব্যবহারের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
বিধ্বংসী বন্যা: বিপরীত চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি ও বন্যা হতে পারে। এর আগে ২০১৫-২০১৬ সালের এল নিনোর সময় ফসলহানির কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছিল।
দাবানলের ঝুঁকি: তীব্র তাপ ও খরা পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাজন রেইনফরেস্টে ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাস্তুতন্ত্র ও কৃষি: সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রবাল প্রাচীরগুলো হুমকির মুখে পড়ছে এবং ‘কোরাল ব্লিচিং’ (প্রবাল বিবর্ণ হয়ে মারা যাওয়া) ঘটছে। অন্যদিকে, ভারতের আম চাষিরা জানিয়েছেন যে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে আমের মুকুল ও ফলন ব্যাহত হয়েছে।
ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের ওপর প্রভাব: আবহাওয়া বিজ্ঞানী ব্রায়ান ট্যাং জানান, এল নিনোর কারণে আটলান্টিক মহাসাগরে মেঘ, বজ্রঝড় ও ঘূর্ণিঝড় কমে যায়। তবে ঝড় কম হলেও কোনো ঝড় একবার শক্তিশালী রূপ নিলে তা মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। অপরদিকে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব সম্পূর্ণ উল্টো—সেখানে এটি আরও ঘন ঘন এবং শক্তিশালী ঝড় তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
জার্মানির ন্যাশনাল ওসিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাইকেল ম্যাকফ্যাডেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনোকে শক্তিশালী না করলেও এর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি স্বাভাবিক খরাকে এটি চরম খরায় রূপান্তর করতে পারে।
আগে থেকেই প্রস্তুতির সুযোগ: বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এল নিনোর একটি ইতিবাচক দিক হলো এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে তৈরি হয় এবং কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে, ফসল রক্ষা করতে বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পায়।

আপনার মতামত লিখুন